― Advertisement ―

লস অ্যাঞ্জেলেসে ইরানি ড্রোন ও বোমা বিক্রির অভিযোগে এক নারী গ্রেপ্তার

যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ এক বড় ধরনের আন্তর্জাতিক অস্ত্র পাচার ষড়যন্ত্র নস্যাৎ করার দাবি করেছে। ইরানের পক্ষে সুদানসহ বিভিন্ন দেশের সশস্ত্র বাহিনীর কাছে ড্রোন, বোমা ও আধুনিক সামরিক সরঞ্জাম পাচারের চেষ্টার অভিযোগে লস অ্যাঞ্জেলেস থেকে ৪৪ বছর বয়সী শামিম মাফি নামের এক নারীকে গ্রেপ্তার করেছে ফেডারেল কর্তৃপক্ষ। শনিবার (১৮ এপ্রিল ২০২৬) রাতে লস অ্যাঞ্জেলেস আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে দেশত্যাগের সময় তাঁকে নাটকীয়ভাবে আটক করা হয়।

ফেডারেল প্রসিকিউটরদের দেওয়া অভিযোগপত্র অনুযায়ী, শামিম মাফি ইরান ও সুদানের সশস্ত্র বাহিনীর মধ্যে একটি শক্তিশালী মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করছিলেন। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি বিপুল পরিমাণ ড্রোন, শক্তিশালী বোমা, বোমার ফিউজ এবং কয়েক লাখ রাউন্ড গোলাবারুদ বিক্রির চুক্তিতে সরাসরি সম্পৃক্ত ছিলেন। এই গোপন লেনদেন বিশ্বনিরাপত্তার জন্য এক বড় হুমকি হিসেবে দেখছে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো।

মার্কিন প্রসিকিউটর বিল এসায়েলি জানিয়েছেন, এই তদন্তের মাধ্যমে এক বিশাল আর্থিক লেনদেনের চিত্র উঠে এসেছে। শামিম মাফি এবং তাঁর এক সহযোগী ওমানভিত্তিক একটি ছদ্মবেশী প্রতিষ্ঠানের আড়ালে এসব অস্ত্র চুক্তি পরিচালনা করতেন। গোয়েন্দা তথ্যানুযায়ী, কেবল ২০২৫ সালেই এই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে কয়েক মিলিয়ন মার্কিন ডলারের লেনদেন সম্পন্ন হয়েছে। এর একটি বড় অংশ ইরানি ড্রোন ক্রয়ে ব্যয় করা হয়েছিল বলে জানা গেছে।

মামলার নথি থেকে জানা যায়, মাফি সরাসরি ইরানের প্রভাবশালী বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (IRGC) সাথে যোগাযোগ রক্ষা করতেন। তিনি ইরান থেকে অস্ত্র ক্রয়ের জন্য আনুষ্ঠানিক ‘লেটার অব ইন্টেন্ট’ বা আগ্রহপত্র জমা দিয়েছিলেন। এই নথিগুলো পাচারের উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হয়েছিল বলে দাবি করেছে এফবিআই (FBI)। বিশেষ করে সুদানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের কাছে হাজার হাজার বোমার ফিউজ সরবরাহের যে চুক্তি তিনি করেছিলেন, তা গৃহযুদ্ধে বিধ্বস্ত দেশটির সংঘাতকে আরও উসকে দেওয়ার নামান্তর।

সুদান বর্তমানে ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ গৃহযুদ্ধে বিপর্যস্ত। এমন এক অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে একটি দেশের কাছে ইরানের তৈরি ড্রোন ও বোমা সরবরাহ আন্তর্জাতিক মহলে বড় ধরনের উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে যে, মাফির এই কর্মকাণ্ড আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা (International Sanctions) এবং ‘আর্মস এক্সপোর্ট কন্ট্রোল অ্যাক্ট’ এর চরম লঙ্ঘন।

তদন্তকারীরা জানিয়েছেন, শামিম মাফি অত্যন্ত চতুরতার সাথে তাঁর কার্যক্রম পরিচালনা করতেন। ওমানকে ট্রানজিট পয়েন্ট হিসেবে ব্যবহার করে তিনি ইরান থেকে বিভিন্ন গন্তব্যে অস্ত্র পাঠাতেন। মার্কিন গোয়েন্দারা দীর্ঘ সময় ধরে তাঁর আর্থিক লেনদেন এবং ইমেইল যোগাযোগের ওপর নজর রাখছিলেন। অবশেষে অকাট্য প্রমাণ হাতে আসতেই তাঁকে গ্রেপ্তারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

সোমবার (২০ এপ্রিল ২০২৬) শামিম মাফিকে লস অ্যাঞ্জেলেসের একটি ফেডারেল আদালতে হাজির করার কথা রয়েছে। সেখানে তাঁর বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক চার্জ গঠন করা হবে। আদালতের নথি বলছে, যদি তাঁর বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগগুলো প্রমাণিত হয়, তবে তাঁকে সর্বোচ্চ ২০ বছর কারাদণ্ড ভোগ করতে হতে পারে। এ ছাড়া বড় অংকের আর্থিক জরিমানারও বিধান রয়েছে।

মার্কিন বিচার বিভাগের এই পদক্ষেপকে ইরানের বৈশ্বিক নেটওয়ার্কের ওপর এক বড় আঘাত হিসেবে দেখা হচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকায় ইরানের ক্রমবর্ধমান সামরিক প্রভাব নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র এবং তার মিত্র দেশগুলো অত্যন্ত সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। এই গ্রেপ্তার সেই গোয়েন্দা তৎপরতারই একটি অংশ বলে মনে করা হচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, শামিম মাফির মতো ব্যক্তিদের গ্রেপ্তার আন্তর্জাতিক অস্ত্র চোরাচালান চক্রের মূল শিকড় উৎপাটনে সাহায্য করবে। তবে ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী যেভাবে বিভিন্ন ছদ্মবেশী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে তাদের অস্ত্র রপ্তানি চালিয়ে যাচ্ছে, তা নিয়ন্ত্রণ করা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

পরিশেষে বলা যায়, লস অ্যাঞ্জেলেসের এই গ্রেপ্তার কেবল একজন ব্যক্তির আটক হওয়া নয়, বরং এটি একটি বিশাল ভূ-রাজনৈতিক সংঘাতের অংশ। ইরানের ড্রোন প্রযুক্তির প্রসার এবং সুদানের গৃহযুদ্ধে তার প্রয়োগ বিশ্বশান্তির জন্য যে নতুন সংকট তৈরি করছে, শামিম মাফির এই মামলা সেই ভয়াবহতারই দলিল।