ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যকার সম্পর্কে যখন নতুন করে মেরুকরণের হাওয়া বইছে, ঠিক তখনই এক নজিরবিহীন সিদ্ধান্ত নিল নরেন্দ্র মোদী সরকার। ঢাকার পরবর্তী ভারতীয় হাইকমিশনার হিসেবে দেশটিতে পাঠানো হচ্ছে প্রবীণ রাজনীতিবিদ এবং প্রাক্তন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী দিনেশ ত্রিবেদীকে। দীর্ঘ সময় পর প্রতিবেশী কোনো রাষ্ট্রে পেশাদার কূটনীতিকের পরিবর্তে কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে নিয়োগ দেওয়া হলো। ত্রিবেদী বর্তমান হাইকমিশনার প্রণয় ভার্মার স্থলাভিষিক্ত হবেন, যিনি ব্রাসেলসে ইউরোপীয় ইউনিয়নে ভারতের দূত হিসেবে দায়িত্ব নিতে চলেছেন।
৭৫ বছর বয়সী দিনেশ ত্রিবেদী ভারতের রাজনীতিতে এক অভিজ্ঞ মুখ। এক সময় তৃণমূল কংগ্রেসের হয়ে রেলমন্ত্রী এবং স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করা এই নেতা ২০২১ সালে বিজেপিতে যোগ দেন। ব্যারাকপুরের প্রাক্তন এই সংসদ সদস্যকে ঢাকায় পাঠানো কেবল একটি রুটিন নিয়োগ নয়, বরং এটি দিল্লির পক্ষ থেকে দক্ষিণ এশীয় কূটনীতিতে বড় ধরণের পরিবর্তনের ইঙ্গিত। বিশেষ করে পেশাদার কূটনীতিকদের পরিবর্তে একজন ‘হেভিওয়েট’ রাজনীতিবিদকে পাঠানোর মাধ্যমে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে যে, ঢাকার সাথে সম্পর্কের গুরুত্ব এখন অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি।
২০২৬ সালের এই বিশেষ সন্ধিক্ষণে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের এক অস্থির সময় পার করছে। বিশেষ করে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন শাসনামলে দুই দেশের সম্পর্কে যে শৈত্যপ্রবাহ দেখা দিয়েছিল, তা কাটিয়ে ওঠাই হবে ত্রিবেদীর প্রধান চ্যালেঞ্জ। দিল্লির নীতিনির্ধারকরা মনে করছেন, ইউনূসের মেয়াদে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর সহিংসতা এবং ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে যে আস্থার সংকট তৈরি হয়েছিল, তা পুনরুদ্ধারে একজন তুখোড় রাজনীতিবিদের ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক প্রজ্ঞা বেশি কার্যকর হবে।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এই সিদ্ধান্তটি মূলত তারিক রহমান সরকারের সাথে সম্পর্কের একটি নতুন ‘রিসেট’ বা নতুন শুরুর ইঙ্গিত। সাধারণত এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলো ভারতীয় পররাষ্ট্র ক্যাডারের (IFS) কর্মকর্তাদের জন্য সংরক্ষিত থাকলেও, ত্রিবেদীর মতো হাই-প্রোফাইল নেতাকে নিয়োগ দিয়ে মোদী সরকার বোঝাতে চাইছে যে, প্রতিবেশীদের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখতে এখন আর কেবল আমলাতান্ত্রিকতায় সীমাবদ্ধ থাকবে না দিল্লি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ত্রিবেদীর মতো একজন প্রবীণ নেতাকে পাঠানো ঢাকার বর্তমান প্রশাসনের প্রতি দিল্লির এক ধরণের জবাবদিহিতারও বার্তাবাহক। এর আগে সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল দলবীর সিং সুহাগকে সেচেলসে রাষ্ট্রদূত হিসেবে পাঠিয়েছিল ভারত। তবে দক্ষিণ এশীয় উপকূলে এই ধরণের নিয়োগ ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, ‘সুসময়ের রাষ্ট্রদূত’ পাঠানোর দিন শেষ; এখন প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার সক্ষমতা রাখা ব্যক্তিত্বদেরই বেছে নেওয়া হচ্ছে। ত্রিবেদীর এই নতুন ইনিংস দুই দেশের বাণিজ্যিক ও কৌশলগত সম্পর্কে কতটা গতি ফেরাতে পারে, এখন সেটাই দেখার বিষয়।
তথ্যসূত্র: হিন্দুস্তান টাইমস



