― Advertisement ―

সম্পর্ক স্বাভাবিক করার পথে বেইজিং ও তাইপেই: সরাসরি ফ্লাইট ও বাণিজ্যিক দ্বার খুলছে চীন

পূর্ব এশিয়ার রাজনীতিতে দীর্ঘদিনের উত্তেজনা কমিয়ে আনার এক নতুন ইঙ্গিত দিয়ে তাইওয়ানের সাথে স্থগিত থাকা কিছু গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক পুনরায় চালুর ঘোষণা দিয়েছে চীন। দীর্ঘ বিরতির পর দুই পক্ষের মধ্যে সরাসরি বিমান চলাচল বৃদ্ধি এবং তাইওয়ানের জলজ পণ্য আমদানির ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার এই সিদ্ধান্তকে একটি বড় ধরনের কূটনৈতিক নমনীয়তা হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। রবিবার (১২ এপ্রিল ২০২৬) বেইজিংয়ের পক্ষ থেকে এই আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসে, যা অঞ্চলটির ব্যবসায়িক ও রাজনৈতিক মহলে ইতিবাচক সাড়া ফেলেছে।

এই ঘোষণার সময়টি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তাইওয়ানের প্রধান বিরোধী দল ‘কুওমিনতাং’ (KMT)-এর এক শীর্ষ নেত্রীর চীন সফর শেষ হওয়ার পরপরই এই ছাড় দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিল শি জিনপিং প্রশাসন। চীনের কমিউনিস্ট পার্টির (CCP) অধীনস্থ তাইওয়ান বিষয়ক দপ্তর এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, তারা কেবল বাণিজ্যিক নয়, বরং রাজনৈতিক পর্যায়েও দীর্ঘমেয়াদি যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তোলার সম্ভাবনা খতিয়ে দেখছে। এর ফলে দুই পক্ষের মধ্যে বছরের পর বছর ধরে চলা অচলাবস্থা কাটতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।

ঘোষণা অনুযায়ী, চীনের প্রধান প্রধান শহরগুলোর সাথে তাইওয়ানের সরাসরি ফ্লাইটের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করা হবে। করোনাকালীন পরিস্থিতি এবং পরবর্তীতে রাজনৈতিক উত্তজনা বৃদ্ধির ফলে এই যোগাযোগ ব্যবস্থা প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছিল। সরাসরি ফ্লাইট চালু হলে দুই অঞ্চলের মধ্যে পর্যটন এবং ব্যবসায়িক যাতায়াত কয়েক গুণ বেড়ে যাবে, যা উভয় দেশের অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। বিশেষ করে ব্যবসায়ী এবং সাধারণ নাগরিকদের ভোগান্তি লাঘবে এই পদক্ষেপটি ছিল দীর্ঘ প্রতীক্ষিত।

বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও একটি বড় সুখবর দিয়েছে বেইজিং। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিভিন্ন অজুহাতে তাইওয়ানের জলজ চাষের পণ্য (যেমন—মাছ ও সামুদ্রিক খাদ্য) আমদানির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল চীন। এখন সেই সব পণ্য আমদানির প্রক্রিয়া সহজতর করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তাইওয়ানের মৎস্যজীবীদের জন্য এটি একটি বিশাল স্বস্তির সংবাদ, কারণ তাদের উৎপাদিত পণ্যের একটি বড় বাজার হলো মূল ভূখণ্ড চীন। অর্থনৈতিক এই বিনিময় দুই পক্ষের মধ্যে শত্রুতা কমিয়ে আনার একটি সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করবে।

কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, চীনের এই পদক্ষেপটি মূলত তাইওয়ানের আসন্ন নির্বাচনের আগে একটি কৌশলী চাল হতে পারে। বিরোধী দল কুওমিনতাং-এর সাথে সখ্যতা বাড়িয়ে চীন এটি প্রমাণ করতে চায় যে, সঠিক রাজনৈতিক সমঝোতা থাকলে তাইওয়ানের মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত হওয়া সম্ভব। এর মাধ্যমে তাইওয়ানের সাধারণ ভোটারদের মনে চীনের প্রতি একটি ইতিবাচক ধারণা তৈরির চেষ্টা করছে বেইজিং।

তবে এই বাণিজ্যিক ও পর্যটন সম্পর্কের উন্নতি মানেই যে রাজনৈতিক উত্তেজনা পুরোপুরি মিটে গেছে, তা ভাবার কোনো কারণ নেই। চীন এখনো তাইওয়ানকে তাদের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে দাবি করে এবং প্রয়োজনে সামরিক শক্তি ব্যবহারের হুমকি দিয়ে রেখেছে। অন্যদিকে তাইওয়ানের বর্তমান সরকার সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে আপসহীন। ফলে এই ‘সফট পাওয়ার’ বা নমনীয় নীতি কতদিন স্থায়ী হবে, তা নিয়ে বড় ধরনের সংশয় রয়েই গেছে।

চীনের কমিউনিস্ট পার্টি জানিয়েছে, তারা কুওমিনতাং পার্টির সাথে একটি স্থায়ী প্রাতিষ্ঠানিক যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে চায়। এতে করে ভবিষ্যতে কোনো সংকট তৈরি হলে সরাসরি আলোচনার মাধ্যমে তা সমাধান করা সম্ভব হবে। এই ধরনের রাজনৈতিক সংলাপের প্রস্তাবটি এশিয়ায় মার্কিন প্রভাবকে চ্যালেঞ্জ করার একটি মাধ্যম হিসেবেও দেখা হচ্ছে। বেইজিং দেখাতে চায় যে, বাইরের হস্তক্ষেপ ছাড়াই তারা নিজেদের আঞ্চলিক সমস্যা সমাধান করতে সক্ষম।

তাইওয়ানের জলজ পণ্যের রপ্তানি পুনরায় শুরু হলে দ্বীপরাষ্ট্রটির রপ্তানি আয় বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে। মৎস্য চাষের সাথে যুক্ত হাজার হাজার পরিবার এখন নতুন করে স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছে। সরাসরি ফ্লাইটের টিকিট বুকিংও ইতিমধ্যে বাড়তে শুরু করেছে বলে বিভিন্ন ট্রাভেল এজেন্সি সূত্রে জানা গেছে। দুই দেশের মানুষের মধ্যে এই যোগাযোগ বৃদ্ধি পেলে হয়তো যুদ্ধের দামামা কিছুটা হলেও স্তিমিত হবে।

পরিশেষে বলা যায়, চীনের এই ঘোষণাটি বৈশ্বিক রাজনীতির বর্তমান প্রেক্ষাপটে একটি বড় ঘটনা। এক চিলতে সরাসরি ফ্লাইট এবং কিছু সামুদ্রিক মাছের বাণিজ্য হয়তো বিশাল রাজনৈতিক বিভেদকে এক নিমিষে মিটিয়ে দেবে না, কিন্তু এটি নিশ্চিতভাবেই আলোচনার নতুন এক দুয়ার উন্মোচন করেছে। এখন দেখার বিষয়, তাইওয়ানের বর্তমান সরকার এই উদ্যোগকে কীভাবে গ্রহণ করে এবং ওয়াশিংটন এই নতুন সমীকরণে কী প্রতিক্রিয়া জানায়।