রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অকুতোভয় ছাত্র আবু সাঈদ হত্যাকাণ্ডের বিচারিক প্রক্রিয়া এক ঐতিহাসিক পরিণতির দিকে পৌঁছাল। জুলাইয়ের সেই রক্তঝরা গণ-অভ্যুত্থানের প্রথম শহীদ সাঈদকে হত্যার দায়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ আজ বৃহস্পতিবার বড় ধরনের রায় ঘোষণা করেছেন। রায়ে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে অভিযুক্ত দুই পুলিশ সদস্যকে মৃত্যুদণ্ড এবং তিনজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিশেষ বেঞ্চ জনাকীর্ণ আদালতে এই রায় প্রদান করেন। সাঈদের সেই বুক পেতে দেওয়ার দৃশ্য যা দেশবাসীকে নাড়া দিয়েছিল, আজ আইনি লড়াইয়ের মাধ্যমে তার স্বীকৃতি মিলল।
আদালতের রায়ে সর্বোচ্চ দণ্ড মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে পুলিশের সাবেক সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) আমির হোসেন এবং কনস্টেবল সুজন চন্দ্র রায়কে। ট্রাইব্যুনাল তাদের পর্যবেক্ষণে বলেছে, সরাসরি লক্ষ্যভেদ করে নিরস্ত্র শিক্ষার্থীর ওপর গুলি চালানো ছিল ক্ষমতার জঘন্য অপব্যবহার। অন্যদিকে যাবজ্জীবন দণ্ডপ্রাপ্তদের তালিকায় রয়েছেন পুলিশের সাবেক সহকারী কমিশনার মো. আরিফুজ্জামান এবং পরিদর্শক রবিউল ইসলামসহ অন্য তিন সদস্য। সাজাপ্রাপ্ত পুলিশের এই উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের অনেকেই বর্তমানে পলাতক থাকলেও তাদের গ্রেফতারে রেড অ্যালার্ট জারির প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
এই হত্যাকাণ্ডে কেবল গুলিবর্ষণকারীরাই নয়, বরং বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন প্রশাসনের প্রত্যক্ষ মদদ ও উসকানি ছিল বলে রায়ে স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য মো. হাসিবুর রশীদকে তার অপরাধের গুরুত্ব বিবেচনায় ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এছাড়াও সাবেক প্রক্টর শরিফুল ইসলামকে পাঁচ বছর এবং গণিত ও লোকপ্রশাসন বিভাগের শিক্ষকদের বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড প্রদান করা হয়েছে। আদালত বলেছে, যারা অভিভাবক হয়ে ঘাতকদের ক্যাম্পাসে পথ দেখিয়েছেন, তারা ইতিহাসের কলঙ্ক হিসেবে চিহ্নিত হবেন।
মামলার মোট ৩০ জন আসামির মধ্যে অর্ধেকেরও বেশি পলাতক থাকলেও বিচারিক প্রক্রিয়ায় কোনো বাধা পড়েনি। রংপুর মহানগর পুলিশের সাবেক কমিশনারসহ বেশ কয়েকজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সাজা দেওয়ার পাশাপাশি তৎকালীন ক্ষমতাসীন ছাত্রসংগঠন ছাত্রলীগের সাত নেতার বিরুদ্ধেও তিন থেকে দশ বছর মেয়াদী দণ্ডাদেশ দেওয়া হয়েছে। আবু সাঈদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত এই রায় কেবল একটি পরিবারকে শান্তি দেবে না, বরং ভবিষ্যতে রাষ্ট্রীয় বাহিনীর নৃশংসতা রোধে একটি শক্তিশালী উদাহরণ হয়ে থাকবে বলে মনে করছেন আইনি বিশেষজ্ঞরা।



