শিক্ষাঙ্গনের পবিত্রতা আর শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্কের সংজ্ঞাকে এক নিমিষেই ধুলোয় মিশিয়ে দিল এক পৈশাচিক প্রতিহিংসা। কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) সমাজকল্যাণ বিভাগের চেয়ারম্যান ও সহযোগী অধ্যাপক আসমা সাদিয়া লুনা (যিনি শিক্ষার্থীদের কাছে রুনা ম্যাম হিসেবে পরিচিত) নিজ বিভাগীয় কক্ষে এক অধস্তন কর্মচারীর নৃশংস হামলার শিকার হয়ে প্রাণ হারিয়েছেন। বুধবার (৪ মার্চ ২০২৬) বিকেলের এই রক্তক্ষয়ী ঘটনায় কেবল একটি বিভাগ নয়, স্তব্ধ হয়ে গেছে পুরো বিশ্ববিদ্যালয়। ঘাতক ফজলুর রহমান, যিনি ওই বিভাগেরই প্রাক্তন কর্মচারী ছিলেন, শিক্ষককে হত্যার পর নিজের গলায় ছুরি চালিয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করেছেন। বর্তমানে তিনি আশঙ্কাজনক অবস্থায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের মূলে ছিল দাপ্তরিক প্রশাসনিক ক্ষোভ। ফজলুর রহমানের বেতন সংক্রান্ত কিছু জটিলতা দীর্ঘদিনের এবং সম্প্রতি তাকে সমাজকল্যাণ বিভাগ থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে বদলি করা হয়। ধারণা করা হচ্ছে, এই বদলি এবং বেতন সংক্রান্ত ঝামেলার জন্য তিনি বিভাগীয় প্রধান আসমা সাদিয়া লুনাকেই দায়ী মনে করতেন। সেই চরম ক্ষোভ থেকেই বুধবার বিকেলে চেয়ারম্যানের রুমে প্রবেশ করে তিনি অতর্কিতে ম্যামের গলায় ধারালো ছুরি দিয়ে আঘাত করেন। রক্তক্ষরণ এবং গুরুতর জখমের ফলে শিক্ষককে বাঁচানো সম্ভব হয়নি।
এই ঘটনা ক্যাম্পাসের নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে চরম প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। সাধারণ শিক্ষার্থীরা কান্নায় ভেঙে পড়েছেন এবং ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ শুরু করেছেন। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, ক্যাম্পাসে অপরাধের বিচারহীনতার সংস্কৃতিই এমন দুঃসাহস তৈরি করছে। এর আগে সাজিদ আবদুল্লাহ নামে এক শিক্ষার্থীকে হত্যা করে পুকুরে ফেলে রাখা হয়েছিল, যার বিচার আজও নিশ্চিত হয়নি। আজ একজন বিভাগীয় প্রধানের নিজ কক্ষে খুন হওয়ার ঘটনা সেই বিচারহীনতার ক্ষতকেই আরও গভীর করল।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। সমাজকল্যাণ বিভাগের করিডোর এখন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে। শিক্ষক সমিতির পক্ষ থেকে এই হত্যাকাণ্ডের তীব্র নিন্দা জানিয়ে অবিলম্বে তদন্ত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানানো হয়েছে। একজন মেধাবী শিক্ষক, যিনি শিক্ষার্থীদের আগামীর স্বপ্ন দেখাতেন, তাকে এভাবে প্রশাসনিক প্রতিহিংসার বলি হতে হওয়ায় শোকের পাশাপাশি সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে দানা বাঁধছে তীব্র নিরাপত্তা শঙ্কা। ক্যাম্পাসের ইতিহাসে এই দিনটি এক কালো অধ্যায় হিসেবেই চিহ্নিত হয়ে থাকবে।



