মানবতার বিরোধী অপরাধ এবং ১৯৯৪ সালের রুয়ান্ডার ভয়াবহ গণহত্যার মূল অর্থায়নকারী ও উসকানিদাতা ফেলিসিয়েন কাবুগা নেদারল্যান্ডসের দ্য হেগে অবস্থিত জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক আটক কেন্দ্রে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন। মৃত্যুকালে দীর্ঘকাল পলাতক থাকা এই শীর্ষ যুদ্ধাপরাধী অভিযুক্তের বয়স হয়েছিল ৯১ বছর। শনিবার (১৬ মে, ২০২৬) জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক অবশিষ্ট ট্রাইব্যুনাল বিষয়ক মেকানিজম (IRMCT) প্রাতিষ্ঠানিক বিবৃতির মাধ্যমে বিশ্ববাসীকে তাঁর মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছে। এর মধ্য দিয়ে আফ্রিকার আধুনিক ইতিহাসের অন্যতম বর্বরতম গণহত্যার আইনি বিচার প্রক্রিয়ার একটি বিতর্কিত অধ্যায়ের অবসান ঘটল।
ফেলিসিয়েন কাবুগার বিরুদ্ধে রুয়ান্ডার সেই নৃশংসতম ১০০ দিনে সংখ্যালঘু তুতসি এবং মধ্যপন্থী হুতু সম্প্রদায়ের প্রায় আট লাখ মানুষকে নির্বিচারে হত্যায় সরাসরি মদদ, অর্থায়ন ও উগ্র হুতু মিলিশিয়াদের অস্ত্র সরবরাহের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ছিল। প্রসিকিউটরদের মতে, কাবুগা কেবল মিলিশিয়াদের জন্য হাজার হাজার দা ও অস্ত্র আমদানির অর্থই দেননি, বরং তুতসিদের বিরুদ্ধে চরম জাতিগত বিদ্বেষ ও বিষোদ্গার ছড়ানোর প্রধান হাতিয়ার ‘রেডিও টেলিভিশন লিব্রে দে মিল কলিন’ (RTLM) নামক গণমাধ্যমটি প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনা করেছিলেন, যা সরাসরি মাঠপর্যায়ে গণহত্যা উসকে দিতে মূল ভূমিকা রেখেছিল।
রুয়ান্ডা ট্রাইব্যুনাল ও আন্তর্জাতিক গোয়েন্দাদের চোখ ফাঁকি দিয়ে দীর্ঘ ২৬ বছর ধরে ভুয়া পরিচয় ও ছদ্মবেশে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আত্মগোপনে ছিলেন কাবুগা। পরবর্তীতে ২০২০ সালে ফ্রান্সের প্যারিসের কাছাকাছি একটি শহরতলি থেকে ফরাসি পুলিশ ও আন্তর্জাতিক যৌথ অভিযানে তিনি নাটকীয়ভাবে গ্রেপ্তার হন। এরপর আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর জন্য তাঁকে দ্য হেগের বিশেষ ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তর করা হয়। ২০২২ সালে, ঘটনার প্রায় তিন দশক পর তাঁর ঐতিহাসিক বিচার প্রক্রিয়া শুরু হলেও বার্ধক্যজনিত অসুস্থতা তাঁর শাস্তির পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
পরবর্তীতে ২০২৩ সালে আন্তর্জাতিক আদালত কাবুগাকে চরম ‘ডিমেনশিয়া’ বা স্মৃতিভ্রংশ রোগ এবং মারাত্মক শারীরিক অক্ষমতার কারণে বিচার প্রক্রিয়া মোকাবিলার সম্পূর্ণ অযোগ্য বলে ঘোষণা করে। আদালতের এই রায়ের ফলে বিচারিক কার্যক্রম মাঝপথেই থমকে যায়, যা রুয়ান্ডার গণহত্যার শিকার লাখো পরিবারের মাঝে চরম ক্ষোভ ও হতাশার জন্ম দিয়েছিল। শেষ পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক আইনি রায় বা দণ্ডাদেশ ছাড়াই হেগের বিশেষায়িত চিকিৎসাকেন্দ্রে বন্দি অবস্থায় এই ধনকুবের যুদ্ধাপরাধী অভিযুক্তের শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগের ঘটনাটি আন্তর্জাতিক বিচার ব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রতাকে পুনরায় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে এসেছে।



