মধ্যপ্রাচ্যে অব্যাহত ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, অভ্যন্তরীণ গ্যাস উৎপাদন হ্রাস এবং এলএনজি আমদানির উচ্চ খরচে গভীর জ্বালানি সংকটে পড়েছে বাংলাদেশ। এই প্রেক্ষাপটে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অর্থনৈতিক জোট আসিয়ানের (ASEAN) দেশগুলোর সাথে জ্বালানি ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা বাড়ানোকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার তাগিদ দিয়েছেন নীতি-নির্ধারক, অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ী নেতারা। জ্বালানি খাতের ক্রমবর্ধমান সংকট কাটিয়ে উঠতে সরকারকে ব্যাংক খাত ও জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় জরুরি সংস্কারের পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. ইজাজ হোসেন জানান, দেশের মোট জ্বালানি চাহিদার প্রায় ৬০ শতাংশই আমদানিনির্ভর। দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান স্থবির থাকায় বর্তমানে চাহিদার প্রায় ৩০ শতাংশ এলএনজি হিসেবে আমদানি করতে হচ্ছে। এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে ২০৩০ সালের মধ্যে জ্বালানি আমদানিনির্ভরতা ৯০ শতাংশে পৌঁছাতে পারে, যা জাতীয় অর্থনীতির জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করবে। তিনি এই সংকট মোকাবিলায় অপ্রয়োজনীয় মেগা প্রকল্পের কাজ আপাতত স্থগিত রেখে ব্যাংক ও জ্বালানি খাত পুনরুদ্ধারে মনোযোগ দেওয়ার আহ্বান জানান।
ঘাটতি মেটাতে মিয়ানমার থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে গ্যাস আমদানির কূটনৈতিক পথ পুনরায় চালুর উদ্যোগ নিয়েছে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ সম্প্রতি ঢাকায় নিযুক্ত মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূত উ কিয়াও সো মোইয়ের সাথে বৈঠকে পাইপলাইন ও এলএনজি আকারে গ্যাস আমদানির বিষয়ে ইতিবাচক আলোচনা করেন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ঘোষিত “নেবার ফার্স্ট” নীতির আলোকে চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক করিডোর প্রতিষ্ঠার প্রস্তাবকেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। তবে মিয়ানমারে চলমান গৃহযুদ্ধ, জান্তা সরকারের নিয়ন্ত্রণ হ্রাস এবং ইয়াডানা ও জওতিকা গ্যাসক্ষেত্রের উৎপাদন বার্ষিক ১৮-২০ শতাংশ কমে যাওয়ার কারণে এই প্রকল্প বাস্তবায়ন দীর্ঘমেয়াদি ও চ্যালেঞ্জিং হতে পারে।
এদিকে গ্যাস সংকটে দেশের রপ্তানি আয়ের মূল স্তম্ভ বস্ত্র খাত বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাথে সাক্ষাৎ করে প্রায় ২৫ বিলিয়ন ডলারের এই প্রাথমিক বস্ত্র খাত রক্ষায় জরুরি গ্যাস সরবরাহের দাবি জানান। সুতার অনিয়ন্ত্রিত আমদানি এবং ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদের হার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ নেতাদের সাথে নিয়ে যৌথ রূপরেখা পেশ করার ঘোষণা দেন।
মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতায় প্রণালী সুয়েজ ও হরমুজ সংকটের মুখে পড়ায় বিকল্প জ্বালানি উৎস হিসেবে সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও ব্রুনাইয়ের সাথে কূটনৈতিক আলোচনা জোরদার করা হয়েছে। ইতিপূর্বে ব্রুনাইয়ের সুলতান হাসানাল বলকিয়াহর ঢাকা সফরের সময় স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক কার্যকর করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। একই সাথে আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর ১০.৫ বিলিয়ন ডলারের আমদানির বিপরীতে বাংলাদেশের রপ্তানি মাত্র ১ থেকে ২ শতাংশে সীমাবদ্ধ থাকায় আসিয়ান জোটের সাথে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) স্বাক্ষরের তাগিদ দিয়েছেন বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের (বিসিআই) সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী (পারভেজ)।
জাতীয় অর্থনৈতিক কৌশল বাস্তবায়নে বুয়েট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বিশেষজ্ঞ ও ব্যবসায়ীদের সমন্বয়ে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি নীতি প্রণয়নের পরামর্শ দিয়েছেন জ্বালানি বিশ্লেষকরা। সেমিকন্ডাক্টর রপ্তানি এবং দক্ষ মানবসম্পদ প্রেরণের মাধ্যমে মালয়েশিয়াসহ আসিয়ান অঞ্চলে বাণিজ্য পরিধি বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।



