বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ ও প্রবীণ আওয়ামী লীগ নেতা তোফায়েল আহমেদ আর নেই। রাজধানী ঢাকার স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৮৩ বছর বয়সে তিনি শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন। আজ সোমবার (১ জুন, ২০২৬) বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে এই বর্ষীয়ান রাজনীতিকের জীবনাবসান ঘটে।
তাঁর মৃত্যুর খবরটি সংবাদমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছেন তাঁর জামাতা তৌহিদুজ্জামান তুহিন এবং শ্যালক মামুন তালুকদার শেখ। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্যমতে, দীর্ঘদিন ধরেই তিনি বার্ধক্যজনিত নানাবিধ শারীরিক জটিলতায় ভুগছিলেন। গত বছরের ২৪ সেপ্টেম্বর ফুসফুসের সংক্রমণ, শ্বাসকষ্ট ও হৃদরোগের সমস্যা নিয়ে তিনি হাসপাতালে ভর্তি হন। সেখানে আইসিইউর বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ডা. রায়হান রাব্বানীর অধীনে দীর্ঘ আট মাস আট দিন তিনি চিকিৎসাধীন ছিলেন।
তোফায়েল আহমেদের জন্ম ১৯৪৩ সালের ২২ অক্টোবর ভোলার দক্ষিণ দিঘলদী ইউনিয়নের কোড়ালিয়া গ্রামে। তাঁর বাবার নাম আজহার আলী এবং মায়ের নাম ফাতেমা খানম। ১৯৬০ সালে ভোলা সরকারি হাই স্কুল থেকে প্রবেশিকা পরীক্ষা পাস করে তিনি বরিশালের ব্রজমোহন কলেজে ভর্তি হন। সেখান থেকে বিজ্ঞান বিভাগে উচ্চমাধ্যমিক ও স্নাতক শেষ করে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মৃত্তিকা বিজ্ঞান বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নেন।
কলেজ জীবন থেকেই তাঁর রাজনৈতিক পথচলা শুরু হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় ১৯৬৪ সালে ইকবাল হল ছাত্র সংসদের ক্রীড়া সম্পাদক এবং ১৯৬৬-৬৭ মেয়াদে এই হলের ভিপি নির্বাচিত হন। এরপর ১৯৬৭ থেকে ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত তিনি ডাকসুর ভিপি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এই সময়ই তিনি তৎকালীন ছাত্রসংগঠনগুলোকে ঐক্যবদ্ধ করে ‘সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ’ গঠন করেন এবং ঐতিহাসিক উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের মূল নেতৃত্ব দেন।
বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৬ দফাকে ভিত্তি করে ছাত্রদের ১১ দফা কর্মসূচি প্রণয়ন করেছিলেন তোফায়েল আহমেদ। তাঁর সুদক্ষ নেতৃত্বে গড়ে ওঠা গণআন্দোলনের মুখে তৎকালীন সামরিক শাসক আইয়ুব খান সব রাজবন্দিকে মুক্তি দিতে বাধ্য হন। ১৯৬৯ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি রেসকোর্স ময়দানে লাখো জনতার উপস্থিতিতে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের পক্ষ থেকে তিনি শেখ মুজিবুর রহমানকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করেন।
১৯৭০ সালের জুন মাসে তোফায়েল আহমেদ আনুষ্ঠানিকভাবে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে যুক্ত হন। সেই বছরই মাত্র ২৭ বছর বয়সে ভোলার একটি আসন থেকে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে তিনি অসামান্য অবদান রাখেন। তিনি ছিলেন স্বাধীনতাকামী ‘মুজিব বাহিনী’র (বিএলএফ) চার প্রধানের একজন, যিনি দেশের পশ্চিমাঞ্চলের যুদ্ধ পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন।
দেশ স্বাধীন হওয়ার পর দেশের প্রথম সংবিধান তৈরিতে তিনি সক্রিয় অবদান রাখেন। ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধু তাঁকে প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদায় নিজের রাজনৈতিক সচিব নিযুক্ত করেন। ১৯৭৫ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত তিনি এই দায়িত্বে ছিলেন। এরপর বাকশালের যুব সংগঠন ‘জাতীয় যুবলীগ’-এর সাধারণ সম্পাদক হিসেবেও তিনি দায়িত্ব পালন করেন।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতাকে সপরিবারে হত্যার পর তোফায়েল আহমেদকে বন্দি করা হয়। দীর্ঘ ৩৩ মাস তিনি ময়মনসিংহ ও কুষ্টিয়া কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে কাটান। কারাগারে থাকা অবস্থাতেই ১৯৭৮ সালে তিনি আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৯২ সালে তিনি দলের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য হন এবং দীর্ঘ ১৮ বছর এই পদে দায়িত্ব পালন করেন।
১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ দীর্ঘ ২১ বছর পর সরকার গঠন করলে তিনি শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পান। পরবর্তীতে ২০১৪ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত তিনি দেশের বাণিজ্যমন্ত্রী হিসেবে কাজ করেন। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি নৌকা প্রতীক নিয়ে ১২ বার নির্বাচন করেছেন এবং মোট ৯ বার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন, যার সর্বশেষটি ছিল ২০২৪ সালের দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন।
২০১০ সাল থেকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন। তাঁর ব্যক্তিগত জীবনে স্ত্রী আনোয়ারা বেগম এবং একমাত্র কন্যা ডা. তাসলিমা আহমেদ জামান মুন্নী রয়েছেন। তাঁর এই প্রয়াণে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে এক বিশাল শূন্যতার সৃষ্টি হলো।
পারিবারিক সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, আজ সোমবার বাদ মাগরিব ধানমন্ডির তাকওয়া মসজিদে তাঁর প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হবে। আগামীকাল মঙ্গলবার সকালে হেলিকপ্টারযোগে তাঁর মরদেহ ভোলায় নিয়ে যাওয়া হবে। সেখানে বাদ জোহর ভোলা জিলা স্কুল মাঠে জানাজা শেষে পৈত্রিক গ্রামে বাবা-মায়ের কবরের পাশে এই জননেতাকে সমাহিত করা হবে।



