অতিথি লেখক, এম জসীম উদ্দীনঃ
চীন সম্প্রতি তার দেশের পরিবেশ-প্রতিবেশ সুরক্ষায় একটি যুগান্তকারি পদক্ষেপ নিয়েছে। এই পদক্ষেপটি প্রতিটি দেশের জন্যেই পরিবেশ-প্রতিবেশ রক্ষায় একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হতে পারে। নিঃসন্দেহে বলা যায়, চীন সরকারের এই পদক্ষেপটি অত্যন্ত সাহসী, সময়োপযোগী। কেননা, শিল্প, প্রযুক্তি মানুষকে অভাবনীয় সুবিধা হাতের মুঠোয় এনে দিলেও মানুষের সুস্থ বিকাশ ও এই গ্রহে টিকে থাকার জন্য তার পরিবেশ-প্রতিবেশ ও জীববৈচিত্র্যকে টিকিয়ে রাখার বিকল্প নেই। চীনের এই পদক্ষেপটি সেই বোধেরই বহিঃপ্রকাশ।
সম্প্রতি সাউথ চায়না মনিং নিউজ-এর একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে- চীনের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ নদী চিশুইতে মাছের প্রজনন ক্ষেত্র রক্ষার লক্ষ্যে তিনশ’র বেশি বাঁধ ধ্বংস ও শত শত জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র বন্ধ করে দিয়েছে দেশটির সরকার। এই পদক্ষেপকে দেশটির ইতিহাসে নদী পরিবেশ সংরক্ষণের অন্যতম বড় ও দৃষ্টান্তমূলক উদ্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

দেশটির বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই চমকপ্রদ সিদ্ধান্তের মূল লক্ষ্য হল, ইয়াংসি নদীর বিলুপ্তপ্রায় মাছ, বিশেষ করে ‘ইয়াংসির শেষ দৈত্য’ নামে পরিচিত ইয়াংসি স্টারজন প্রজাতির মাছের প্রজনন ও বেঁচে থাকার পরিবেশ ফিরিয়ে আনা। অনেক বছর ধরে নদীতে নানা বাধা ও শিল্পায়নের কারণে মাছটির প্রাকৃতিক প্রজনন পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। বিজ্ঞানীরা এতদিন ধরে এ প্রজাতিকে ‘বন্য পরিবেশে বিলুপ্ত’ প্রজাতি হিসেবে বিবেচনা করছিলেন। অর্থ্যাৎ এই মাছটি বর্তমানে ‘বন্য পরিবেশে বিলুপ্ত’ হিসেবে তালিকাভুক্ত, যার অর্থ এটি কেবলমাত্র কৃত্রিম পরিবেশে টিকে আছে, প্রাকৃতিক নদীতে নয়।
চীনের জাতীয় সংবাদমাধ্যম ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, মাছটির বিলুপ্তি ঠেকাতে দেশটির গুইঝু, সিচুয়ান ও ইউনান প্রদেশে বিস্তৃত চিশুই নদীর ৩৭৩টি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের মধ্যে ৩৪২টি পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে এবং ৩০০টিরও বেশি বাঁধ ভেঙে ফেলা হয়েছে। এসব বাঁধ ভাঙার ফলে নদীর মূল স্রোতের সঙ্গে ২০টির বেশি উপনদী পুনরায় যুক্ত হয়েছে, যা মাছ ও অন্যান্য জলজ প্রাণীর চলাচলের পথ উন্মুক্ত করেছে।

গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে বিজ্ঞানীরা চিশুই নদীতে পরীক্ষামূলকভাবে ২০টি প্রাপ্তবয়স্ক ইয়াংসি স্টারজন মাছ (১০টি পুরুষ ও ১০টি স্ত্রী) অবমুক্ত করেন। কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই মাছগুলো স্বাভাবিকভাবে প্রজনন করে এবং ডিম ফুটে ছোট ছোট পোনা জন্ম নেয়।
গবেষণাগারে সংগ্রহ করা নমুনা বিশ্লেষণে নিশ্চিত হওয়া গেছে, এসব পোনা সম্পূর্ণ প্রাকৃতিকভাবে উৎপন্ন, যা গত দুই দশকে এই প্রজাতির জন্য প্রথম সফল ঘটনা।
পরিবেশবিদরা বলছেন, চীন সরকার এই পদক্ষেপের মাধ্যমে জলবিদ্যুৎ প্রকল্প ও বাঁধনির্ভর উন্নয়ন নীতির পুনর্মূল্যায়ন করছে। মাছের প্রজনন এলাকা নিশ্চিহ্ন করে ফেলার দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির তুলনায় তাৎক্ষণিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের মুনাফা কতটা মারাত্মক তা এখন প্রতিফলিত হচ্ছে।
চীনের জলসম্পদ বিভাগ জানায়, শুধুমাত্র মাছ নয়, ২০২১ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে নদীতে মাছের ঘনত্ব গড়ে ৯ দশমিক ৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। পাশাপাশি, ৩৬টি অতিরিক্ত স্থানীয় মাছ প্রজাতিও চিহ্নিত করা হয়েছে। আরও আশাব্যঞ্জক বিষয় হলো, ইয়াংসি নদীতে বিপন্নপ্রায় পাখনাবিহীন শুশুক ( finless porpoise) -এর সংখ্যা বৃদ্ধিরও প্রমাণ মিলেছে।
তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, মাছের বেঁচে থাকা শুধু একবারের সফল প্রজননের ওপর নির্ভর করে না। দীর্ঘমেয়াদে তাদের টিকে থাকতে হলে জলপ্রবাহের স্বাভাবিকতা বজায় রাখা, দূষণ নিয়ন্ত্রণ, নদীর তীর রক্ষা এবং স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা জরুরি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এ উদ্যোগ একদিকে যেমন জীববৈচিত্র্য রক্ষায় যুগান্তকারী পদক্ষেপ, অন্যদিকে জলনীতি ও নদী ব্যবস্থাপনায় এক নতুন দৃষ্টান্ত। অনেক দিন ধরেই আন্তর্জাতিক পরিবেশ সংস্থাগুলো বলে আসছিল—ছোট ছোট বাঁধ, তথাকথিত ‘স্মল হাইড্রো প্রজেক্ট’ গুলো আসলে পরিবেশের জন্য মারাত্মক হুমকি। চীনের সাম্প্রতিক পদক্ষেপ সেই বাস্তবতাকে একরকম আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দিল।
চীনের চিশুই নদীতে যে প্রক্রিয়ায় বাঁধ ও বিদ্যুৎকেন্দ্র অপসারণ করা হয়েছে, তা বিশ্বের অন্যান্য দেশের জন্য একটি মডেল বা শিক্ষণীয় উদাহরণ হতে পারে—বিশেষ করে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার নদীবিধৌত দেশগুলোর জন্য, যেখানে উন্নয়নের নামে এখনও ব্যাপক হারে নদীতে বাঁধ ও জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের প্রকল্প চলছে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে চীনের এই উদ্যোগ অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক ও শিক্ষণীয় হতে পারে। কারণ, বাংলাদেশও একটি নদীমাতৃক দেশ, যেখানে অসংখ্য নদ-নদী দেশের প্রাণরসায়ন বহন করে চলেছে। তবে বাস্তবতা হলো, অতীতের ভুল পরিকল্পনা, অপরিকল্পিত বাঁধ ও ক্লোজার নির্মাণ, দখল-দূষণ এবং নদী ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা আমাদের দেশের নদীগুলোকে ধীরে ধীরে মৃতপ্রায় করে তুলেছে। এতে নদীর প্রাকৃতিক প্রবাহ ব্যাহত হয়েছে, জলজ প্রাণী ও মাছের প্রজনন হুমকির মুখে পড়েছে, এমনকি স্থানীয় জলবায়ুও বদলে গেছে।
বাংলাদেশ বিশ্বের সবচেয়ে বেশি ইলিশ উৎপাদনকারি দেশ হলেও গত কয়েক বছর ধরে এসব কারণে ইলিশের উৎপাদনে ধস নামার শঙ্কা তৈরি হয়েছে। অনেক দেশি প্রজাতির মাছ এখন সংকটাপন্ন অবস্থায় পড়েছে। অনেক মাছ প্রাকৃতিক জলাধারে বিলুপ্ত হয়ে গেছে। তাই চীনের মতো বিজ্ঞানভিত্তিক, দূরদৃষ্টিসম্পন্ন, সাহসী ও পরিবেশবান্ধব সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের জন্যও সময়োপযোগী উদাহরণ হতে পারে।
মাছের প্রজননক্ষেত্র রক্ষা, নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনা এবং ক্ষতিগ্রস্ত জীববৈচিত্র্য পুনরুদ্ধারে বাঁধ বা ব্যারেজের কার্যকারিতা পর্যালোচনা করা, অপ্রয়োজনীয় ও ক্ষতিকর স্থাপনাগুলো পর্যায়ক্রমে অপসারণের পরিকল্পনা নেওয়া এখন সময়ের দাবি। সেই সঙ্গে স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণে একটি টেকসই নদীনীতি প্রণয়ন জরুরি, যেখানে কৃষি ও বাস্তুতন্ত্র—একসঙ্গে বিবেচনায় নেওয়া হবে। চীনের পদক্ষেপ দেখিয়েছে, নদী শুধু অর্থনীতির উৎস নয়, একটি জীবন্ত সত্তা—যার প্রাণ ফেরালে মানুষ-প্রকৃতি-পরিবেশ উভয়ই উপকৃত হয়।



