― Advertisement ―

ফিলিস্তিন নীতি বদলালে দুর্বল হবে কাশ্মীর এজেন্ডা! ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দেওয়া ইসলামাবাদের জন্য ‘রাজনৈতিক আত্মহত্যা’

পাক-মার্কিন কূটনৈতিক সম্পর্কের টানাপোড়েনের মাঝে ওয়াশিংটনে পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইশাক দার এবং মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর সাম্প্রতিক বৈঠকের পর একটি ঐতিহাসিক প্রশ্ন আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে নতুন করে তোলপাড় সৃষ্টি করেছে: পাকিস্তান কি শেষ পর্যন্ত ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দেবে? দীর্ঘ সাত দশক ধরে পাকিস্তানি পাসপোর্টে খোদাই করা ‘ইসরায়েল ছাড়া বিশ্বের সব দেশের জন্য বৈধ’—এই সংক্ষিপ্ত বাক্যটি কেবল একটি আইনি নিষেধাজ্ঞা নয়, বরং এটি পাকিস্তানের পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম প্রধান স্তম্ভ। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে ইরানের সাথে যুদ্ধাবসানের শান্তিপ্রস্তাবের শর্ত হিসেবে ‘আব্রাহাম চুক্তি’র বাধ্যতামূলক সম্প্রসারণের ঘোষণা ইসলামাবাদের এই দীর্ঘস্থায়ী নীতিকে এক নজিরবিহীন ও কঠিন মনস্তাত্ত্বিক পরীক্ষার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে।

সম্প্রতি মার্কিন সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহাম সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক হুঁশিয়ারি বার্তায় স্পষ্ট করে বলেছেন যে, ট্রাম্পের প্রস্তাবিত এই আঞ্চলিক শান্তি চুক্তি ও সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের পথ যদি ইসলামাবাদ প্রত্যাখ্যান করে, তবে মার্কিন-পাক দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ভবিষ্যৎ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ওয়াশিংটনের এই প্রবল চাপ সত্ত্বেও পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা মোহাম্মদ আসিফ অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে তা প্রত্যাখ্যান করে জানিয়েছেন, পাকিস্তান এমন কোনো আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার অংশ হতে পারে না, যা রাষ্ট্রের ‘মৌলিক আদর্শ’ ও ফিলিস্তিনিদের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকারের পরিপন্থী। ইসলামাবাদ তার এই অনড় অবস্থানে স্পষ্ট করেছে যে, ১৯৬৭ সালের পূর্ববর্তী সীমান্তের ভিত্তিতে একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা এবং যার রাজধানী হবে পূর্ব জেরুজালেম—এই শর্ত পূরণ না হওয়া পর্যন্ত ইসরায়েলের সাথে কোনো ধরনের আপস সম্ভব নয়।

ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, উপসাগরীয় রাজতন্ত্রগুলোর মতো একক সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ পাকিস্তানের নেই; কারণ দেশটির পররাষ্ট্রনীতি সংসদ, ইসলামপন্থী রাজনৈতিক দল, অত্যন্ত সক্রিয় গণমাধ্যম এবং ৯১ শতাংশ ফিলিস্তিনপন্থী অনমনীয় জনমতের দ্বারা সরাসরি নিয়ন্ত্রিত। যেকোনো সরকারের জন্য ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দেওয়া মানে হবে দেশে গৃহযুদ্ধ ও রাজনৈতিক আত্মহত্যার শামিল। তদুপরি, পাকিস্তান আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ফিলিস্তিন ও কাশ্মীরের দীর্ঘস্থায়ী স্বাধীনতা সংগ্রামকে সর্বদা একই সমান্তরালে এবং আত্মনিয়ন্ত্রণের আইনি অধিকারের দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করে আসছে। ফলে ফিলিস্তিনি সংকটের স্থায়ী সমাধান ছাড়া ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দিলে কাশ্মীর প্রশ্নে ইসলামাবাদের নৈতিক ও কূটনৈতিক বয়ানের মূল ভিত্তিটিই আন্তর্জাতিক মহলে সম্পূর্ণ ভেঙে পড়বে।

যদিও পাকিস্তানের অর্থনীতি ও কৌশলগত নিরাপত্তা অনেকাংশে সৌদি আরবের আর্থিক অনুদান, বিনিয়োগ এবং লাখো রেমিট্যান্স যোদ্ধার কর্মসংস্থানের ওপর নির্ভরশীল, তবুও রিয়াদ নিজেই এখন পর্যন্ত দ্বিরাষ্ট্র নীতির (Two-State Solution) পক্ষে অনড় অবস্থান বজায় রেখেছে। বিশেষ করে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের পর গাজায় ইসরায়েলি বাহিনীর বর্বরোচিত সামরিক অভিযান ও গণহত্যার দৃশ্য মুসলিম বিশ্বের পাশাপাশি পাকিস্তানের জনমতকে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে বহুগুণ কঠোর করে তুলেছে। অতীতে আফগানিস্তান সংকট ও চীনের সাথে কৌশলগত অক্ষ গঠনে ওয়াশিংটনের তীব্র চাপ উপেক্ষা করে ইসলামাবাদ যেভাবে নিজস্ব স্বাধীন নীতি বজায় রেখেছিল, ঠিক তেমনি চলমান গাজা সংকটের প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের লেনদেনভিত্তিক চাপ ও জবরদস্তির মুখে পাকিস্তান তার দীর্ঘদিনের ঐতিহাসিক ‘রেডলাইন’ অতিক্রম করবে না বলেই আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহল মনে করে।