― Advertisement ―

কোণঠাসা বিজেপি কি রাজনৈতিক অস্তিত্ব রক্ষায় আবার উগ্র হিন্দুত্বেই ভরসা খুঁজছে?

টানা আড়াই দশক ক্ষমতায় থাকার পর নানামুখী রাজনৈতিক ও সামাজিক চাপে কোণঠাসা হয়ে পড়েছে ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)। উদ্ভূত এই পরিস্থিতি কাটিয়ে উঠতে দলটি আবারও নিজেদের পুরোনো রাজনৈতিক হাতিয়ার উগ্র হিন্দুত্ববাদের দিকে ঝুঁকছে। উত্তর প্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ কিংবা মহারাষ্ট্রের সাম্প্রতিক ঘটনাবলী দলটির এই নীতিগত পরিবর্তনের দিকেই ইঙ্গিত করছে।

বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে এখন উত্তর প্রদেশের সাহারানপুর। জেলা প্রশাসকের কার্যালয় সংলগ্ন ১৫০ বছরের পুরোনো এক ঐতিহাসিক মসজিদ গত শনিবার প্রশাসনিক বুলডোজার চালিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। সরকারি জমি দখলের অভিযোগে বজরং দলের এক নেতার মামলায় গত ১৬ জুলাই সিটি ম্যাজিস্ট্রেট মসজিদটি অবৈধ ঘোষণা করেন এবং কর্তৃপক্ষের ওপর ৬ কোটি ৪১ লাখ টাকা জরিমানা ধার্য করেন। জেলা জজ আদালতেও আপিল খারিজ হওয়ার পর গত ২ সেপ্টেম্বর তড়িঘড়ি করে উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয়। উচ্চতর আদালতে যাওয়ার সুযোগ না দিয়েই পুলিশি পাহারায় শনিবার ভোরে মসজিদটি ভেঙে ফেলে প্রশাসন। বাধা দিতে গিয়ে সমাজবাদী পার্টির সংসদ সদস্য ইকরা হোসেন গৃহবন্দী হন। এই ঘটনার তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে হায়দরাবাদের এআইএমআইএম সাংসদ আসাদউদ্দিন ওয়েইসি হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, এর উপযুক্ত জবাব দেওয়া হবে।

অযোধ্যার বাবরি মসজিদ, কাশী, মথুরা, সম্ভল বা ভোজশালার আইনি লড়াই দীর্ঘদিনের। এমনকি কলকাতা বিমানবন্দর প্রাঙ্গণের মসজিদ স্থানান্তর নিয়েও বছরের পর বছর আলোচনা চলছে। কিন্তু সাহারানপুরে উচ্চ আদালতে যাওয়ার সুযোগ না দিয়ে যেভাবে তড়িঘড়ি প্রশাসন পদক্ষেপ নিয়েছে, তা নজিরবিহীন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সামনেই উত্তর প্রদেশ বিধানসভা নির্বাচন। টানা তৃতীয়বার মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার দৌড়ে থাকা যোগী আদিত্যনাথ রাজ্যে ঠাকুর বা ক্ষত্রিয়দের প্রাধান্য দিতে গিয়ে ব্রাহ্মণ সমাজের ক্ষোভের মুখে পড়েছেন। রাম মন্দিরের কোষে চুরি, নিট (NEET) ও চাকরির পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং জেন-জি (Gen-Z) ও সিজেপি’র (ককরোচ জনতা পার্টি) ব্যানারে ছাত্র আন্দোলনের কারণে রাজ্য রাজনীতি এখন তুমুল উত্তপ্ত।

দিল্লির যন্তর মন্তরে আন্দোলনকারী এক নাবালিকা ছাত্রীর বাবাকে খুনের চেষ্টার অভিযোগ উঠেছে স্বতন্ত্র ভরদ্বাজ নামের এক যুবকের বিরুদ্ধে। অভিযুক্ত যুবক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ্য বড়াই করে বলেন, বিজেপি নেতা কপিল মিশ্র, চিরাগ পাসোয়ান ও স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তাঁর ‘রক্ষক’। ব্যাপক গণপ্রতিবাদ ও দিল্লির পার্লামেন্ট স্ট্রিট থানা ঘেরাওয়ের পর পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করতে বাধ্য হয়। অন্যদিকে কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধীর ‘ছাত্রো কি গুঞ্জ’ কর্মসূচি বিপুল সাড়া ফেলায় এবং সমাজবাদী পার্টি ও কংগ্রেসের জোট শক্ত ভিত পাওয়ায় বিজেপি তীব্র রাজনৈতিক চাপের মুখে পড়েছে।

এই রাজনৈতিক কোণঠাসা অবস্থা ঢাকা দিতেই কট্টর হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলোকে উসকে দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ। সম্প্রতি বিশ্ব হিন্দু পরিষদ (ভিএইচপি) ‘ধর্ম যার যার, উৎসব সবার’ স্লোগান খারিজ করে ‘ধর্ম যার যার, উৎসবও তার তার’ নীতি ঘোষণা করেছে। দুর্গাপূজায় আমিষ খাবারের স্টল নিষিদ্ধ করার দাবিতে পশ্চিমবঙ্গে বাঙালি সনাতনীদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। মহারাষ্ট্রে গরবা ও ডান্ডিয়া অনুষ্ঠানে মুসলমানদের প্রবেশ ঠেকাতে আধার কার্ড পরীক্ষা এবং তিলক যাচাইয়ের নির্দেশ জারি করা হয়েছে।

একইভাবে উত্তর ভারতে দুর্গাপূজার সময় অনুষ্ঠিত রামলীলা ও রামনবমীর আসর থেকে অ-হিন্দু অভিনেতা ও দর্শকদের বাদ দেওয়ার নির্দেশ দিচ্ছে ভিএইচপি। এর আগে বিশিষ্ট অভিনেতা নওয়াজউদ্দিন সিদ্দিকিকেও রামলীলায় অভিনয় করতে বাধা দেওয়া হয়েছিল। সার্বিক পরিস্থিতিতে ভারতীয় জনতা পার্টির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব সম্পূর্ণ নীরবতা বজায় রাখছে। আপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছে, ক্রমবর্ধমান গণ-অসন্তোষ ও রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বিজেপি নেতৃত্ব আবারও উগ্র হিন্দুত্ববাদকেই তাঁদের প্রধান রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে বেছে নিয়েছে।