― Advertisement ―

সিরিয়ায় সংখ্যালঘু আলাওয়ি নারীদের অপহরণ, ধর্ষণ ও ‘যৌন দাসী’ হিসেবে ব্যবহারের ভয়াবহ অভিযোগ 

একটি দীর্ঘশ্বাসের শব্দ আর অন্ধকারের ভীতি এখন সিরিয়ার লাতাকিয়া প্রদেশের প্রতিটি আলাওয়ি পরিবারের নিত্যসঙ্গী। কিশোরী রামিয়ার (ছদ্মনাম) কাছে একটি উষ্ণ গ্রীষ্মের পিকনিকের স্মৃতি এখন এক বিভীষিকায় পরিণত হয়েছে। সাদা রঙের একটি সাধারণ গাড়ি কীভাবে তাঁর জীবনকে তছনছ করে দিয়েছিল, সেই বর্ণনা দিতে গিয়ে আজও শিউরে ওঠেন তিনি। সশস্ত্র ব্যক্তিরা যখন তাঁকে জোর করে তুলে নিয়ে যাচ্ছিল, তখন তাঁর পরিচয়ই হয়ে উঠেছিল তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় অভিশাপ। “সুন্নি না আলাওয়ি?”—অপহরণকারীদের এই একটি প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারিত করে দিয়েছিল তাঁর ওপর চলা পরবর্তী নির্যাতনের মাত্রা। বাশার আল-আসাদের পতনের পর থেকে সিরিয়ার রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের বলি হচ্ছেন এই সংখ্যালঘু নারীরা, যাঁদের ওপর চালানো হচ্ছে পদ্ধতিগত যৌন সহিংসতা ও অপহরণ।

সিরিয়ান ফেমিনিস্ট লবি (SFL) এবং অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল-এর মতো সংগঠনগুলো এই নারকীয় পরিস্থিতির যে চিত্র তুলে ধরেছে, তা যেকোনো সভ্য সমাজকে লজ্জিত করে। তথ্য অনুযায়ী, নিখোঁজ হওয়া অধিকাংশ নারীই আলাওয়ি সম্প্রদায়ের, যা মোট জনসংখ্যার মাত্র ১০ শতাংশ। অপহরণকারীরা কেবল তাঁদের তুলে নিয়েই ক্ষান্ত হয়নি, বরং মধ্যযুগীয় বর্বরতাকে ফিরিয়ে এনে ‘সাবায়া’ বা যৌনদাসী হিসেবে তাঁদের ব্যবহারের ঘৃণ্য মানসিকতা পোষণ করছে। নেসমা কিংবা লিনের মতো ভুক্তভোগীদের জবানবন্দিতে উঠে এসেছে টানা কয়েকদিনের বন্দিদশা, বারবার ধর্ষণ এবং আত্মহত্যার ব্যর্থ চেষ্টার করুণ কাহিনী। এই নারীদের পণ্য হিসেবে বিবেচনা করে বিক্রির জন্য ছবি তোলার মতো জঘন্য ঘটনাগুলো প্রমাণ করে যে, সিরিয়ায় এখন মানবতার কোনো স্থান নেই।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো সিরিয়ার অন্তর্বর্তী সরকারের উদাসীনতা এবং তদন্তে চরম ব্যর্থতা। ভুক্তভোগী পরিবারগুলো যখন নিখোঁজ স্বজনদের সন্ধানে থানায় যাচ্ছে, তখন কর্মকর্তাদের উপহাস আর অবজ্ঞার শিকার হতে হচ্ছে। সরকারের পক্ষ থেকে অধিকাংশ অপহরণের ঘটনাকে ‘স্বেচ্ছায় পালিয়ে যাওয়া’ বা ‘পারিবারিক সহিংসতা’ বলে চালিয়ে দেওয়ার যে প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, মানবাধিকার কর্মীরা তাকে ‘দায়মুক্তির সংস্কৃতি’ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের মতে, পরিবারগুলো কোনো বিশ্বাসযোগ্য তদন্তের তথ্য পাচ্ছে না, যা অপরাধীদের আরও উৎসাহিত করছে। এই নীরবতা ও নিষ্ক্রিয়তা সংখ্যালঘু নারীদের মধ্যে এক গভীর আতঙ্ক ও নিরাপত্তাহীনতার জন্ম দিয়েছে।

এই শারীরিক ও মানসিক আঘাতের রেশ ভুক্তভোগীদের জীবনে দীর্ঘস্থায়ী ক্ষত তৈরি করছে। রামিয়া আজও ঘুমের মধ্যে চিৎকার করে ওঠেন, নেসমার সাজানো সংসার ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে, আর লিন দরজায় সামান্য টোকা পড়লেই আতঙ্কে কুঁকড়ে যান। সামাজিক কলঙ্ক আর নতুন করে প্রতিশোধের ভয়ে অনেকেই মুখ খুলতে সাহস পাচ্ছেন না। সিরিয়ার মানবাধিকার কর্মী ইয়ামেন হুসেইন যেমনটি বলেছেন, এই অপহরণগুলোর মূল উদ্দেশ্য হলো পরাজিত পক্ষকে মানসিকভাবে পিষ্ট করা এবং অপমানের মাধ্যমে তাঁদের সমাজচ্যুত করা। ১৬ জন নারী আজও নিখোঁজ রয়েছেন, যাঁদের ফিরে আসার সম্ভাবনা সময়ের সাথে সাথে ক্ষীণ হয়ে আসছে। সিরিয়ার আকাশে এখন কেবলই দীর্ঘশ্বাস আর বিচারহীনতার হাহাকার।