বাংলাদেশে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও নতুন সরকার গঠনের পর ঢাকা ও আঙ্কারার মধ্যকার দ্বিপাক্ষিক ও কূটনৈতিক সম্পর্কে এক অভূতপূর্ব নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে। ব্রুনাইয়ে নিযুক্ত তুরস্কের রাষ্ট্রদূত এবং ডিপ্লোম্যাটিক কোরের ডিন অধ্যাপক ড. হামিত এরসয় এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, আগামী বছরগুলোতে বাংলাদেশ ও তুরস্ক কেবল দুই দেশের জনগণের স্বার্থেই নয়, বরং বৈশ্বিক শান্তি, স্থিতিশীলতা, উন্নয়ন এবং একটি সুষম আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে আরও নিবিড়ভাবে কাজ করবে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে গঠিত নতুন সরকার ঢাকা ও আঙ্কারার মধ্যকার ঐতিহ্যগত ভ্রাতৃত্বপূর্ণ সম্পর্ককে আরও বেগবান ও গতিশীল করার একটি ঐতিহাসিক সুযোগ তৈরি করেছে।
দুই দেশের এই কূটনৈতিক সম্পর্ক কোনো নির্দিষ্ট সরকার, রাজনৈতিক দল বা সাময়িক পরিস্থিতির ওপর নির্ভরশীল নয়, বরং এর ভিত্তি গভীর ভ্রাতৃত্ব, শক্তিশালী জনযোগাযোগ এবং ঐতিহাসিক সংহতির ওপর প্রতিষ্ঠিত। ২০২৬ সালের ৫-৬ জুন তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদানের সাম্প্রতিক ঢাকা সফর এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাথে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক এই গভীর সম্পর্কেরই বহিঃপ্রকাশ। এই সংক্ষিপ্ত সময়ের মধ্যে উচ্চপর্যায়ের সংলাপ দুই দেশের মধ্যকার রাজনৈতিক বোঝাপড়াকে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য, বিনিয়োগ এবং বিশেষ করে প্রতিরক্ষা খাতের আধুনিকায়নে একটি নতুন কৌশলগত মাত্রায় রূপান্তর করেছে।
দ্বিপাক্ষিক অর্থনৈতিক অংশীদারত্বকে আরও সুসংহত করতে বর্তমান ১.৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বাণিজ্যকে আগামীতে ২ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার অন্তর্বর্তীকালীন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে দুই দেশের বিশাল জনসংখ্যা ও গতিশীল বেসরকারি খাতের সক্ষমতা বিবেচনায় নিলে এই লক্ষ্যমাত্রা অত্যন্ত সীমিত। আঙ্কারার মূল লক্ষ্য কেবল পণ্য বাণিজ্য নয়, বরং যৌথ বিনিয়োগ, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং তুর্কি ও বাংলাদেশি করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত জোট গঠন করা। এর পাশাপাশি তুরস্কের আন্তর্জাতিক মানের প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ প্রতিরক্ষা শিল্প বাংলাদেশের সামরিক আধুনিকায়নে একটি বড় এবং নির্ভরযোগ্য অংশীদার হতে পারে।
বিশ্ব রাজনীতি ও অর্থনীতির কেন্দ্রবিন্দু ক্রমশ এশিয়ার দিকে স্থানান্তরিত হওয়ার এই ক্রান্তিকালে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ায় এবং বৈশ্বিক দক্ষিণের (Global South) একটি অন্যতম প্রভাবশালী কণ্ঠস্বর হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। এই পরিবর্তনশীল বহুপাক্ষিক বিশ্বব্যবস্থায় দুই দেশেরই উচিত কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন বজায় রেখে অংশীদারত্বের বৈচিত্র্যকরণ করা। একই সাথে রোহিঙ্গা সংকটে তুরস্কের মানবিক সংহতি ও কক্সবাজারে তুর্কি ফিল্ড হাসপাতালের সেবা দুই দেশের মধ্যকার প্রথাগত কূটনীতির ঊর্ধ্বে উঠে এক অনন্য মানবিক বন্ধন তৈরি করেছে, যা আগামী দিনে দুই দেশের বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষক এবং সংবাদমাধ্যমের মেলবন্ধনে আরও সুদৃঢ় হবে।



