বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যকার কৌশলগত ও অর্থনৈতিক অংশীদারত্বকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্য নিয়ে চীন সফরে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। মালয়েশিয়া সফর শেষে সোমবার (২২ জুন, ২০২৬) রাতে প্রধানমন্ত্রীর চীনের দালিয়ানে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। এই হাই-প্রোফাইল দ্বিপক্ষীয় সফরকে কেন্দ্র করে দেশের রাজনৈতিক ও ব্যবসায়ী মহলে নতুন আশাবাদ তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বাণিজ্য সম্প্রসারণ, মেগা অবকাঠামো, দ্রুত শিল্পায়ন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, ডিজিটাল অর্থনীতি এবং অত্যাধুনিক প্রযুক্তি খাতে দুই দেশের সহযোগিতা এই সফরের মাধ্যমে এক অভূতপূর্ব গতি পেতে যাচ্ছে। বর্তমানে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ, অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং যোগাযোগ খাতে চীনের উল্লেখযোগ্য অংশগ্রহণ দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সরবরাহকৃত তথ্য অনুযায়ী, এই গুরুত্বপূর্ণ সফরকালে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সংক্রান্ত প্রায় ১৫ থেকে ১৭টি সমঝোতা স্মারক (MoU), চুক্তি ও কৌশলগত কর্মপরিকল্পনা স্বাক্ষরিত হতে পারে। দালিয়ানে অবস্থানকালে প্রধানমন্ত্রী ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের (WEF) বিখ্যাত ‘সামার দাভোস’ সম্মেলনে অংশ নেবেন এবং বৈশ্বিক জলবায়ু নেতৃত্ববিষয়ক একটি বিশেষ অধিবেশনে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরে গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য রাখবেন। এরপর তিনি বেইজিংয়ে চীনের শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক বৈঠক ছাড়াও বিভিন্ন সরকারি, বেসরকারি এবং শীর্ষস্থানীয় আর্থিক প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের নীতিনির্ধারণী সভায় মিলিত হবেন।
২৫ জুন বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) কর্তৃক আয়োজিত ‘বাংলাদেশ ইনভেস্টমেন্ট ফোরাম’-এ প্রধান অতিথি হিসেবে অংশ নেবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সেখানে তিনি বিশ্বমঞ্চে এবং চীনা বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর সামনে বাংলাদেশের উদীয়মান বাজার ও বিনিয়োগের অফুরন্ত সম্ভাবনা সবিস্তারে তুলে ধরবেন। বর্তমানে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যকার বার্ষিক দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় ২২ থেকে ২৫ বিলিয়ন ডলার। তবে এই বিশাল বাণিজ্য কাঠামো মূলত আমদানিনির্ভর হওয়ায় বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি অনেক বেশি। দেশের শীর্ষ ব্যবসায়ী নেতারা মনে করেন, তৈরি পোশাক (RMG), প্রক্রিয়াজাত চামড়া, কৃষিপণ্য, হালকা প্রকৌশল এবং প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্যের জন্য শুল্কমুক্ত চীনা বাজার সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে এই বাণিজ্য ভারসাম্যে আমূল পরিবর্তন আনা সম্ভব।
বাংলাদেশ-চায়না চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (BCCCI) সভাপতি মোহাম্মদ খোরশেদ আলম গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রীর এই সফর দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি নতুন দিগন্তের সূচনা করবে। তবে এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে কাঙ্ক্ষিত চীনা বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে হলে বাংলাদেশে নীতিগত স্থিতিশীলতা, দ্রুত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন এবং নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি ও লজিস্টিকস সুবিধা নিশ্চিত করা আবশ্যক। অন্যদিকে, চীনের অন্যতম বৃহৎ অবকাঠামো উন্নয়ন প্রতিষ্ঠান সিসিইসিসির (CCECC) দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের নির্বাহী পরিচালক ইউসেফ শু জানিয়েছেন, চীনা বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশের উদীয়মান বাজার নিয়ে অত্যন্ত আগ্রহী। সামগ্রিকভাবে, এই সফরের দীর্ঘমেয়াদি সাফল্য মূলত চুক্তিগুলোর দ্রুত বাস্তবায়ন, রপ্তানি বহুমুখীকরণ এবং প্রযুক্তি স্থানান্তরের (Technology Transfer) ওপর নির্ভর করছে।



