পিরোজপুর জেলায় ডেঙ্গু পরিস্থিতি মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। আক্রান্তের সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়ায় পুরো বরিশাল বিভাগের মধ্যে পিরোজপুরে সর্বোচ্চ সংক্রমণের রেকর্ড তৈরি হয়েছে। গত আট মাসে জেলার সরকারি হাসপাতালগুলোতে ১,৯৬৫ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছেন। ক্রমাগত রোগীর চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে পিরোজপুর জেলা হাসপাতাল, যেখানে শয্যা সংকটের কারণে ডেঙ্গু আক্রান্তদের মেঝেতেই ঠাঁই নিতে হচ্ছে।
জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের ৭ সেপ্টেম্বরের (২০২৬) তথ্য অনুযায়ী, শেষ ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ২৫ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। বর্তমানে জেলা হাসপাতাল ও বিভিন্ন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে মোট ৮৫ জন রোগী চিকিৎসাধীন। এদের মধ্যে পিরোজপুর জেলা হাসপাতালে ৩৫ জন, ভান্ডারিয়ায় ১৫ জন, নাজিরপুরে ১৩ জন, নেছারাবাদে ১২ জন এবং কাউখালী ও মঠবাড়িয়ায় ৫ জন করে রোগী চিকিৎসা নিচ্ছেন। তবে জিয়ানগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে বর্তমানে কোনো ডেঙ্গু রোগী ভর্তি নেই। এই পিরোজপুর জেলা হাসপাতালেই সর্বোচ্চ ৮৫৪ জন রোগী চিকিৎসা নিয়েছেন। এ পর্যন্ত ১,৮৭৯ জন সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরলেও ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে জেলায় ১ জনের মৃত্যু রেকর্ড করা হয়েছে।
এদিকে রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) একটি দল পিরোজপুরে মাঠপর্যায়ে সরেজমিনে অনুসন্ধান চালিয়ে এডিস মশার প্রজননস্থলের চিত্র তুলে ধরেছে। অনুসন্ধানে দেখা যায়, কেটে রাখা সুপারি গাছের গোড়া, ডাবের খোসা, নার্সারির টব, বাসাবাড়ির ছাদ, নির্মাণাধীন ভবন ও নালায় জমে থাকা পানিতে বিপুল পরিমাণ এডিসের লার্ভা রয়েছে। বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকায় সুপারি ও নারকেল গাছের গোড়ায় জমে থাকা পানি এডিস মশার প্রধান প্রজননকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।
হাসপাতালে ডেঙ্গু ওয়ার্ডের সংকটের কারণে রোগীদের সাধারণ ওয়ার্ডের পাশে এমনকি মেঝেতেও থাকতে হচ্ছে। মারুফা আক্তার নামে চিকিৎসাধীন এক রোগী জানান, চার দিন ধরে তীব্র জ্বর, দুর্বলতা ও বমি ভাব নিয়ে তিনি ভর্তি হয়েছেন। প্রচণ্ড ভিড়ের কারণে পর্যাপ্ত স্থান ও সুচিকিৎসা পেতে চরম কষ্ট হচ্ছে। অন্যদিকে সচেতনতার অভাবে অনেক রোগীকে মশারি ব্যবহার না করতেও দেখা গেছে।
অবশ্য চিকিৎসাসামগ্রীর কোনো ঘাটতি নেই বলে দাবি করেছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। জেলা হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. মো. নিজাম উদ্দিন জানান, রোগীদের জন্য পর্যাপ্ত এনএস১ (NS1) টেস্ট কিট, ওষুধ ও অন্যান্য চিকিৎসা সরঞ্জাম রয়েছে। চিকিৎসক ও নার্সরা ২৪ ঘণ্টা চিকিৎসা সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। সিভিল সার্জন ডা. মো. মতিউর রহমান জানান, সরকারি হাসপাতালে বিনামূল্যে ডেঙ্গু পরীক্ষা করা হচ্ছে এবং পর্যাপ্ত স্যালাইন সরবরাহ রয়েছে।
পিরোজপুর পৌরসভা ও জেলা পরিষদ মশা নিধনে স্প্রে ও সচেতনতামূলক প্রচার কার্যক্রম জোরদার করেছে। তবে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যে, শুধু স্প্রে করে এই প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। জমে থাকা পানি পরিষ্কার করা এবং প্রজননস্থল ধ্বংস না করলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে। বরিশাল বিভাগে পিরোজপুরের পরই দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছে প্রতিবেশী জেলা ঝালকাঠিতে।



