নিজস্ব প্রতিবেদক
সব কাজ শেষ হলেও পর্যাপ্ত কয়লা সরবরাহ ও সঞ্চালন লাইনের জটিলতার কারণে দফায় দফায় পিছিয়ে যাচ্ছে এক হাজার ৩২০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন পায়রা তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরুর তারিখ। অবকাঠামোগত সব কাজ শেষ করে কেন্দ্রটি সচল রাখতে প্রতিদিন ব্যয় হচ্ছে অন্তত পাঁচ কোটি টাকা।
প্রকল্পের পরিচালন ব্যয়, বিদেশি ও স্থানীয় পরামর্শক ফি, রক্ষণাবেক্ষণ ও মেরামত, প্রশাসনিক খাতসহ বিভিন্ন ব্যয়ে প্রতি মাসে গুনতে হচ্ছে অতিরিক্ত ১২ মিলিয়ন ডলার বা বাংলাদেশি মুদ্রায় ১৪৬ কোটি ১৬ লাখ টাকার বেশি। দৈনিক হিসাবে যার পরিমাণ দাঁড়ায় ৫ কোটি টাকা।
আর্থিক এ ক্ষতির বিষয়টি মূল্যায়ন করে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডকে (বিপিডিবি) দেওয়া চিঠিতে কেন্দ্রটির পরিচালনা প্রতিষ্ঠান আরপিসিএল-নরিনকো পাওয়ার ইন্টারন্যাশনাল কোম্পানি বলছে, বাণিজ্যিক উৎপাদন বিলম্বিত হওয়ায় কেন্দ্রটির অতিরিক্ত ব্যয় যুক্ত হবে প্রকল্পের মোট নির্মাণ ব্যয়ের সঙ্গে। এতে সামগ্রিক প্রকল্প ব্যয় উল্লেখযোগ্য হারে বেড়ে যাবে, যা শেষ পর্যন্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন ট্যারিফে সরাসরি প্রভাব ফেলবে। যার মাশুল গুনতে হতে পারে গ্রাহকদের।
আর এই ব্যয় বৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে আরএনপিএলের উৎপাদিত বিদ্যুতের ইউনিটপ্রতি খরচ পড়বে অন্যান্য কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রের তুলনায় অনেকটাই বেশি। ফলে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহকৃত বিদ্যুতের গড় মূল্যও বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

জানা যায়, পটুয়াখালীর কলাপাড়ায় স্থাপিত আরএনপিএলের বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি নির্মাণে মোট ব্যয় হচ্ছে ২ দশমিক ৫৪ বিলিয়ন ডলার। এতে অর্থায়ন করেছে চীনের এক্সিম ব্যাংক। তবে নির্ধারিত সময়ে বাণিজ্যিক উৎপাদনে যেতে না পারায় দাতা সংস্থা অর্থায়ন স্থগিত রাখবে বলে আরপিসিএলের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। ইতোমধ্যেই এ প্রকল্পে বিশেষজ্ঞদের বসিয়ে রাখাসহ বিভিন্ন খাতে আর্থিক ক্ষতির কথা জানিয়েছে ইপিসি (ইঞ্জিনিয়ারিং প্রকিউরমেন্ট কনস্ট্রাকশন) ঠিকাদারও।
জানা যায়, পায়রায় আরএনপিএলের বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি চালানোর ক্ষেত্রে সঞ্চালন লাইন সংকটের বিষয়টি বার বার সামনে আনা হলেও মূল সংকটটি কয়লার সরবরাহ নিয়ে। আড়াই বছরের বেশি সময় পার হলেও এখনো কেন্দ্রটির জন্য নির্ভরযোগ্য কোনো কয়লা সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান চূড়ান্ত করতে পারেনি সরকার।
আল্ট্রা সুপার ক্রিটিক্যাল প্রযুক্তি সম্পন্ন এই বিদ্যুৎ কেন্দ্রটির প্রথম ইউনিট জাতীয় গ্রিডে প্রথম সংযুক্ত হয় চলতি বছরের ১৯ জানুয়ারি, আর দ্বিতীয় ইউনিট ৯ এপ্রিল। এর পর থেকে বিপিডিবি কেন্দ্রটির প্রথম ইউনিট থেকে পরীক্ষামূলকভাবে সীমিত আকারে বিদ্যুৎ নিচ্ছে। তবে কেন্দ্রটির পুরো সক্ষমতা কবে নাগাদ ব্যবহার হতে পারে সে বিষয়ে জানতে চাইলে আরএনপিএলের কোনো কর্মকর্তা মন্তব্য করতে রাজি হননি।
এ বিষয়ে আরএনপিএলের বিদ্যুৎ কেন্দ্রের বাণিজ্যিক উৎপাদনের বিষয়ে জানতে চাইলে বিপিডিবির চেয়ারম্যান প্রকৌশলী রেজাউল করিম গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, ‘আরএনপিএল কর্তৃপক্ষ বিদ্যুৎ কেন্দ্রটির বাণিজ্যিক উৎপাদনের বিষয়টি আমাদের জানিয়েছে। আমরা পিজিসিবি (পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশ লিমিটেড) থেকে একটি ইউনিটের বিষয়ে ক্লিয়ারেন্স পেয়েছি।’
তিনি বলেন, ‘বাকি ইউনিট ইভাক্যুয়েশন লাইনের ওপর নির্ভর করছে। পিজিসিবি কবে এ লাইন সম্পন্ন করবে, সে বিষয়ে আমরা কোনো তথ্য পাইনি। ফলে কেন্দ্রটির একটা ইউনিটের বিদ্যুৎ আমাদের দ্রুত নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।’
আরএনপিএলের আর্থিক ক্ষতির বিষয়টি জানিয়ে বিপিডিবিকে সম্প্রতি চিঠি দিয়েছেন আরএনপিএলের পরিচালক ও আরপিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ড. নাজমুস সায়াদাত। চিঠির বিষয়ে জানতে গতকাল মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও নাজমুস সায়াদাত সাড়া দেননি।



