বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার বিদ্যমান কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক বর্তমানে অত্যন্ত ইতিবাচক ও গতিশীল ধারায় অগ্রসর হচ্ছে। উভয় দেশ আগামী দিনগুলোতে এই বহুমুখী অংশীদারত্বকে আরও শক্তিশালী ও সুদৃঢ় করতে একসাথে কাজ করবে। গত বৃহস্পতিবার রাতে রাজধানীর রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া বিষয়ক বিশেষ দূত সার্জিও গোরের সাথে এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠক শেষে সাংবাদকদের মুখোমুখি হয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান এই আশাবাদ ব্যক্ত করেন। উক্ত দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবীরও উপস্থিত ছিলেন।
বৈঠকের প্রেক্ষাপট তুলে ধরে পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, সাম্প্রতিক সময়ে ম্যানিলায় অনুষ্ঠিত এসিয়ান আঞ্চলিক ফোরামের বৈঠকের ফাঁকে তিনি সার্জিও গোর এবং মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর সাথে অত্যন্ত সফল বৈঠক সম্পন্ন করেছেন। তার ধারাবাহিকতায় ঢাকায় অনুষ্ঠিত এই সংক্ষিপ্ত আলোচনাও বেশ ফলপ্রসূ হয়েছে। বাণিজ্য, বিনিয়োগ, জ্বালানি সহযোগিতা এবং বৈশ্বিক অভিবাসনের মতো মৌলিক ক্ষেত্রগুলো উভয় দেশের আলোচনায় গুরুত্ব পেয়েছে। কোনো একটি একক বৈঠকের ওপর সম্পর্ক নির্ভর করে না উল্লেখ করে তিনি বলেন, কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার ধারাবাহিকতা বজায় রেখেই বর্তমান সরকার ওয়াশিংটনের সাথে সকল স্তরে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করে চলছে।
উভয় দেশের মধ্যকার ক্রমবর্ধমান বাণিজ্য সম্পর্কের উদাহরণ টেনে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ শুধু জাতীয় পতাকাবাহী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের মাধ্যমেই নয়, বরং দেশের বেসরকারি এভিয়েশন খাতের বিকাশ ঘটাতে মার্কিন উড়োজাহাজ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান বোয়িং থেকে বিমান সংগ্রহ করছে। এটি দুই দেশের জোরালো অর্থনৈতিক সহযোগিতার এক চমৎকার দৃষ্টান্ত।
মার্কিন শুল্কনীতি ও বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত প্রসঙ্গে ড. রহমান বিভ্রান্তি দূর করে স্পষ্ট ব্যাখা দেন। তিনি জানান, মার্কিন ট্রেড আইনের ধারা ৩০১-এর অধীনে তদন্তের পর বাংলাদেশের ওপর শুল্ক ১০ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। যেখানে অনেক দেশকে ১২ থেকে সাড়ে ১২ শতাংশ শুল্ক গুনতে হচ্ছে, সেখানে ১০ শতাংশ হার বাংলাদেশের জন্য একটি বড় স্বস্তি। এর চেয়েও বড় অর্জিত সাফল্য হলো ‘ট্যারিফ কোটা সিস্টেম’। এই ব্যবস্থার আওতায় যেসব বাংলাদেশি পোশাক তৈরিতে মার্কিন তুলা বা যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানিকৃত কৃত্রিম তন্তু ব্যবহার করা হবে, সেগুলো মার্কিন বাজারে বিশেষ সুবিধা পাবে।
রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অকৃত্রিম সহায়তার প্রশংসা করে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এই মানবিক সহায়তার অর্ধেকেরও বেশি জোগায় ওয়াশিংটন। তবে মিয়ানমারের ওপর সরাসরি চাপ সৃষ্টি বা মানবিক করিডোর তৈরির মতো বিষয় নিয়ে এই বৈঠকে কোনো কথা হয়নি বলে তিনি পরিষ্কার করেন। একইভাবে র্যাবের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি জানান, বর্তমান সরকার মানবাধিকার রক্ষায় সম্পূর্ণ অঙ্গীকারবদ্ধ এবং নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিষয়টি একটি চলমান কূটনৈতিক প্রক্রিয়া।
উল্লেখ্য, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান আগামী ৮ সেপ্টেম্বর থেকে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি (UNGA President) হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করতে যাচ্ছেন। নতুন এই বৈশ্বিক দায়িত্ব পালনে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহযোগিতা প্রয়োজন এবং বিশ্বমঞ্চ গঠনে যুক্তরাষ্ট্রের ঐতিহাসিক ভূমিকার কারণে ওয়াশিংটনের সাথে এই সমন্বয় অত্যন্ত অর্থবহ ও সময়োপযোগী। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) ও উদীয়মান প্রযুক্তির বিকাশ নিয়ে তিনি মন্তব্য করেন যে, বিশ্ব এখন এক নতুন প্রযুক্তিগত বাস্তবতার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, তবে এই প্রযুক্তির আন্তর্জাতিক রূপরেখা এখনো পর্যবেক্ষণাধীন।



