ব্রিটিশ রাজত্বের শেষলগ্নে পশ্চিমবঙ্গের জলপাইগুড়ির এক নিভৃত কোণে যখন এক শিশুকন্যার জন্ম হয়, পারিবারিক বন্ধু চিকিৎসক অবনীগুহ নিয়োগী তার নাম রেখেছিলেন ‘শান্তি’। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পারমাণবিক ধ্বংসলীলার পর বিশ্ব তখন শান্তির জন্য ব্যাকুল। কিন্তু কে জানত, পরিবারের সেই আদরের ‘পুতুল’-এর জীবনই একদিন হয়ে উঠবে বাংলাদেশের রাজনীতির সবচাইতে উত্তাল তরঙ্গের কেন্দ্রবিন্দু।
মঙ্গলবার সকালে জীবনের সেই দীর্ঘ ও বর্ণাঢ্য মহাকাব্যের যবনিকা পড়ল। শান্ত স্নিগ্ধ ভোরে জন্ম নেওয়া সেই ‘শান্তি’, যিনি পরবর্তীকালে বাংলাদেশের তিনবারের প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া হিসেবে ইতিহাসের পাতায় নাম লিখিয়েছেন, তিনি চলে গেলেন এক গভীর শূন্যতা রেখে।
পর্দার অন্তরাল থেকে রাজনীতির রাজপথে
জীবনের অর্ধেকটা সময় খালেদা জিয়া কাটিয়েছেন সেনাপতি থেকে রাষ্ট্রনায়ক হওয়া জিয়াউর রহমানের সহধর্মিণী হিসেবে। রাজনীতির আলোকচ্ছটা থেকে দূরে থাকা এক নিভৃতচারী নারী ছিলেন তিনি। কিন্তু ১৯৮১ সালে স্বামী জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ড তাকে এমন এক পরিস্থিতির মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়, যার জন্য তিনি হয়তো প্রস্তুত ছিলেন না।
১৯৮২ সালের জানুয়ারিতে ঘরের সেই একান্ত কোণ ছেড়ে তিনি পা রাখলেন রাজনীতির কর্কটাকীর্ণ পথে। ১৯৮৪ সালের মধ্যে সেই কোমল হৃদয়ের ‘পুতুল’ হয়ে উঠলেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) কান্ডারি। এর মাধ্যমেই জন্ম নিল এক ‘আপসহীন’ রাজনৈতিক সত্তা— আশির দশকের সামরিক স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে রাজপথে যার আপসহীন ভূমিকা তাকে আজীবন এক অনন্য উচ্চতায় আসীন করেছে।
এক অনন্য অগ্রযাত্রা
খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবন ছিল অনেকগুলো ‘প্রথম’-এর সমাহার। ১৯৯১ সালে বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়ে তিনি এক নতুন ইতিহাস রচনা করেন। তার শাসনকাল কেবল ক্ষমতার পালাবদল ছিল না; তার নেতৃত্বেই দ্বাদশ সংশোধনীর মাধ্যমে দেশ রাষ্ট্রপতি শাসিত পদ্ধতি থেকে সংসদীয় গণতন্ত্রে ফিরে আসে।
জলপাইগুড়ির সেই ছোট্ট মেয়েটি ১৯৯১, ১৯৯৬ এবং ২০০১ সালে— মোট তিন মেয়াদে দেশের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন। জাতীয়তাবাদী চেতনা আর রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের কাছে মাথানত না করার দৃঢ়তাই ছিল তার মূল শক্তি।
চারদলীয় জোট গঠন থেকে শুরু করে মুক্তবাজার অর্থনীতিতে পদার্পণ— প্রতিটি ক্ষেত্রেই তিনি ছিলেন বিএনপির অবিসংবাদিত মাতৃমূর্তি।
জীবনের সায়াহ্ন ও এক নিঃসঙ্গ লড়াই
ক্ষমতার মধ্যগগন থেকে তার জীবনের শেষ অধ্যায়টি ছিল একেবারেই বিপরীত। ২০১৮ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত সময়গুলো কেটেছে কারাগারের দেয়াল, হাসপাতালের কেবিন আর গুলশানের ‘ফিরোজা’র নির্জনতায়।
২০১৮ সালে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় সাজাপ্রাপ্ত হয়ে তাকে যেতে হয় কারাগারে। এরপর দীর্ঘ সময় হাসপাতালের বিশেষ অধীনে এবং পরবর্তীকালে নির্বাহী আদেশে শর্তসাপেক্ষ মুক্তিতে নিজ বাসভবনে অনেকটা ‘গৃহবন্দী’ অবস্থায় ছিলেন তিনি।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর ৬ আগস্ট রাষ্ট্রপতির আদেশে তিনি চূড়ান্ত মুক্তি পেলেও, ততদিনে শারীরিক অসুস্থতা তার সেই চিরচেনা তেজস্বিতাকে অনেকটাই ম্লান করে দিয়েছিল।
একটি যুগের অবসান
খালেদা জিয়ার জীবন যেন এক বৃত্ত পূর্ণ করল— ‘শান্তি’ নাম নিয়ে যে যাত্রার শুরু হয়েছিল, তা শেষ হলো কয়েক দশকের রাজনৈতিক লড়াই-সংগ্রামের পর।
তিনি রেখে গেলেন একটি দল এবং এক জাতি— যারা গত চার দশক ধরে তার রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও ব্যক্তিত্বের প্রভাব দেখেছে।
জলপাইগুড়ির বাগানে খেলা করা সেই ‘পুতুল’ আজ ইতিহাসের পাতায় ধ্রুবতারা। যার চিরপ্রস্থান বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি দীর্ঘ ও ঘটনাবহুল যুগের অবসান ঘটাল।



