― Advertisement ―

যৌবন কারাগারে, বার্ধক্যে মুক্তি: সংশপ্তক যোদ্ধা নায়েল বারঘুতি

বিশেষ প্রতিনিধি: নায়েল বারঘুতি যখন ইসরাইলি দখলদারদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করছিলেন তখন তিনি ছিলেন টগবগে তরুণ।

যৌবনের শ্রেষ্ট সময়কে তিনি উৎসর্গ করেছিলেন দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের জন্য। তখন এই সংশপ্তক স্বাধীনতা সংগ্রামীর বয়স ছিল মাত্র ২২ বছর।

সেই তরুণ বয়সে তিনি ইসরাইলি দখরদার বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার হয়ে কারান্তরীণ হয়েছিলেন। তারপর দীর্ঘ ৪৫ বছর তিনি কারাপ্রকোষ্টে কাটিয়েছেন। এর মধ্যে একটানা কেটেছে ৩৪ বছর। সম্প্রতি তাঁকে মুক্তি দিয়েছে ইসরাইল। এখন সেই টগবগে তরুণের বয়স ৬৭ বছর।


জেল জীবন শুরুর আগের তরুণ বারঘুতির জীবনে নেমে এসেছে বার্ধক্যের সায়াহ্ন।

ফিলিস্তিনি এই সংগ্রামী নায়েল বারঘুতি হলেন বিশ্বের সবচেয়ে দীর্ঘ সময় কারাগারে কাটানো রাজনীতিক। তিনি ফিলিস্তিনি বন্দিদের “ডিন” (প্রধান) হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন।

বারঘুতি গতকাল বৃহস্পতিবার মুক্তি পান ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে বন্দি বিনিময় চুক্তির অংশ হিসেবে। ২০০৯ সালের গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ড অনুসারে, তিনি বিশ্বের সবচেয়ে দীর্ঘ সময় কারাবন্দি রাজনৈতিক বন্দি।

২০১১ সালে গিলাদ শালিত বন্দি বিনিময় চুক্তির মাধ্যমে মুক্তি পেলেও, ২০১৪ সালে ইসরায়েল তাঁকে পুনরায় গ্রেপ্তার করে এবং আগের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড পুনর্বহাল করে।

তবে এবার মুক্তির শর্ত হিসেবে তাঁকে ফিলিস্তিনের বাইরে নির্বাসনে থাকতে হবে বলে শর্ত দিয়ে দখলদার ইসলাইল সরকার।

শৈশবেই প্রতিরোধ যুদ্ধে

বারঘুতির জীবন শুরু হয়েছিল নিজ ভূখন্ডকে দখলদার মুক্ত করার প্রতিরোধ সংগ্রামের মধ্যদিয়ে। বারঘুতির জন্ম ১৯৫৭ সালের ২৩ অক্টোবর ফিলিস্তিনের কুবার গ্রামে।

তাঁর পরিবার দীর্ঘদিন ধরে ব্রিটিশ ও ইসরায়েলি দখলদার বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ আন্দোলনে সক্রিয় ছিল।

১৯৬৭ সালে মাত্র ১০ বছর বয়সে বারঘুতি নিজ চোখে দেখেন ইসরায়েলি বাহিনীর দ্বারা তার গ্রাম দখলের নির্মম দৃশ্য, যা তাঁকে প্রতিরোধ আন্দোলনের পথে ধাবিত করেছিল।

ছোটবেলায় প্রতিরোধ সংগ্রামের অংশ হিসেব বারঘুতি দখলদার ইসরায়েলি বাহিনীর দিকে পাথর নিক্ষেপ করতেন।

দেয়ালে দখলবিরোধী স্লোগান লিখতেন। এর মধ্যদিয়ে দখলদার বাহিনীর হাতে তিনি ১৯৭৭ সালে প্রথম গ্রেপ্তার হন। তিন মাস কারাগারে কাটান। এরপর মাধ্যমিক পরীক্ষার প্রস্তুতি নেওয়ার সময় পুনরায় গ্রপ্তার হন এবং টানা ৩৪ বছর কারাবন্দি ছিলেন।

তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল, তিনি ও তার স্বজনরা মিলে এক ইসরায়েলি কর্মকর্তাকে হত্যা করেছিলেন।

কারাগারে সংগ্রামী জীবন

বারঘুতি কারাগারে থেকেই নিজেকে একজন ইতিহাসপ্রেমী পাঠক হিসেবে গড়ে তুলেছিলেন। তিনি হিব্রু ও ইংরেজি ভাষা শিখে পারদর্শী হন এবং বন্দিদের মধ্যে “ডিন অফ প্রিজনার্স” নামে পরিচিতি পান।

একবার বারঘুতি জেল থেকে তাঁর মায়ের কাছে লেবুর বীজ পাচার করেন এবং তাঁকে তা বাড়ির উঠানে রোপণ করতে বলেন,যাতে তিনি নিজের জন্মভূমির সঙ্গে মানসিকভাবে সংযুক্ত থাকতে পারেন।

পরবর্তীতে কারাফটকে প্রতিটি সাক্ষাতে তিনি মায়ের জন্য পানি নিয়ে আসতেন, যাতে তিনি সেই গাছের যত্ন নিতে পারেন। একসময় গাছে ফল আসার পর, তাঁর মা লেবুগুলো লুকিয়ে কারাগারে তাঁর কাছে নিয়ে আসতেন।

রাজনীতি ও প্রেম

ছোটবেলা থেকে ফাতাহ আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত থাকলেও, বারঘুতি ১৯৯০-এর দশকে হামাসে যোগ দেন, যখন ফাতাহ ইসরায়েলের সঙ্গে শান্তিচুক্তি করেছিল। কারাগারে থেকেই তিনি ইমান নাফিকে বিয়ের প্রস্তাব দেন।

ইমান নাফিকে তিনি একটি টেলিভিশন প্রতিবেদনের মাধ্যমে জানতে ও চিনতে পারেন। ২০১১ সালে মুক্তির পর তিনি ইতিহাসে স্নাতক সম্পন্ন করেন এবং নাফিকে বিবাহ করেন।

বিয়ের দিন তিনি বলেছিলেন, “এটি কারাগারের বিরুদ্ধে আরেকটি বিজয়, যাঁরা আমাদের স্বাধীনতা কেড়ে নিয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ, এবং বিশ্বাস ও আশার বিজয়।”

পুনরায় গ্রেপ্তার ও মুক্তি

২০১৪ সালে ইসরায়েলি বাহিনী বারঘুতিকে আবার গ্রেপ্তার করে। তাঁকে ৩০ মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হলেও সাজা শেষ হওয়ার পরও তিনি মুক্তি পাননি। পরে তাঁর আগের যাবজ্জীবন সাজা পুনর্বহাল করা হয়। এক্ষেত্রে একটি “গোপন ফাইল”-এর অজুহাত দেখানো হয়েছিল।

২০২৩ সালে ফিলিস্তিনি বন্দি সংস্থা জানায়, কারাগারে বারঘুতির স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটেছে। গিলবোয়া কারাগারে স্থানান্তরের পর তিনি মারধর ও নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন।

গেল সপ্তাহে তাঁর স্ত্রী নাফি জানান, বারঘুতি তাঁকে ফোন করে জানান, তিনি মুক্তি পাচ্ছেন, তবে শর্ত হলো তাঁকে নির্বাসনে থাকতে হবে।

অবশেষে বৃহস্পতিবার তিনি মিশরে পৌঁছান। তবে ইসরায়েলি বাহিনী নাফিকে তাঁর সঙ্গে দেখা করতে দেয়নি, যা তারঁ জন্য অত্যন্ত বেদনা ও দুঃখজনক।

তিনি বলেন, “ইসলাইলি কর্তৃপক্ষ বলছে এটি নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক কারণে। আমি বুঝতে পারছি না এর অর্থ কী! তবে আমার মতো অনেক পরিবার রয়েছে, যাঁরা মুক্তি পাওয়া বন্দিদের সঙ্গে দেখা করতে যেতে পারছেন না। আমরা আশা করি, শিগগিরই আমাদের অনুমতি দেওয়া হবে।”

নায়েল বারঘুতির এই মুক্তি শুধু তার ব্যক্তিগত বিজয় নয়, বরং এটি ফিলিস্তিনি প্রতিরোধের এক অনন্য দৃষ্টান্ত।

৪৫ বছরের বন্দিত্বও তাঁর মনোবল এতটুকু নোয়াতে বান ভাঙতে পারেনি। এই ইস্ফাতকঠিন সংগ্রামের দৃঢ়তা তাঁকে ইতিহাসের পাতায় চিরস্মরণীয় রাখবে একজন সংশপ্তক সংগ্রামী হিসেবে।


মিডল ইস্ট আই-এর তথ্য অবলম্বনে

বিএম/জ/রা