লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে প্রতিরোধ যোদ্ধা হিজবুল্লাহর পেতে রাখা চোরাগোপ্তা ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর (আইডিএফ) এক ব্যাটালিয়ন প্রধানসহ চারজন ক্রু সেনা নিহত হয়েছেন। পৃথক আরেকটি আত্মঘাতী ড্রোন হামলায় আহত হয়েছেন আইডিএফের আরও অন্তত পাঁচ কমান্ডো সেনা। শুক্রবার (১৯ জুন, ২০২৬) ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী ও হিজবুল্লাহর মধ্যে এই রক্তক্ষয়ী মুখোমুখি সংঘর্ষের তথ্য নিশ্চিত করেছে তেল আবিবের গণমাধ্যম ‘টাইমস অব ইসরায়েল’ ও আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্স। সম্প্রতি মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ বন্ধের লক্ষ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি বিশেষ কৌশলগত সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার পর এই প্রথম এত বড় সামরিক ক্ষয়ক্ষতির মুখে পড়ল ইসরায়েলি বাহিনী।
ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর (আইডিএফ) দাপ্তরিক বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, দক্ষিণ লেবাননের নাবাতিয়েহ অঞ্চলের কাফার তিবনিত গ্রামে মধ্যরাতের দিকে হিজবুল্লাহর একটি শক্তিশালী অ্যান্টি-ট্যাংক ড্রোন বা গাইডেড ক্ষেপণাস্ত্র আইডিএফের ৪০১তম আর্মার্ড ব্রিগেডের ৫২তম ব্যাটালিয়নের কমান্ডিং ট্যাংকে সরাসরি আঘাত হানে। এতে ট্যাংকের ভেতরে থাকা ব্যাটালিয়ন কমান্ডার ৩২ বছর বয়সী লেফটেন্যান্ট কর্নেল দর গেডালিয়া বেন সিমহোন এবং তাঁর সাথে থাকা অপর তিন ক্রু সেনা ঘটনাস্থলেই নিহত হন। আইডিএফ জানিয়েছে, নিহত অন্য তিন সেনার পরিবারকে অবহিত করা হলেও আইনি প্রক্রিয়া ও সামরিক প্রটোকলের কারণে তাৎক্ষণিকভাবে তাদের নাম প্রকাশ করা হয়নি। নিহত লেফটেন্যান্ট কর্নেল সিমহোন উত্তর ইসরায়েলের কিবুতজ বেইত হাশিতার বাসিন্দা ছিলেন এবং এর আগে তিনি নর্দার্ন কমান্ডের চিফ অফ স্টাফ হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছিলেন।
এই ট্যাংক হামলার ঠিক কয়েক ঘণ্টা পর ভোর ৪টার দিকে কাফার তিবনিত এলাকাতেই আইডিএফের ৩৬তম ডিভিশনের অধীনস্থ এলিট কমান্ডো ব্রিগেডের ওপর হিজবুল্লাহর আরেকটি সুনির্দিষ্ট ড্রোন আঘাত হানে। এতে এক রিজার্ভ অফিসার গুরুতর আহত হন এবং আরও চারজন নিয়মিত সেনা সাধারণ জখম নিয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। এই তীব্র সংঘর্ষের পর মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এক হোয়াইট হাউস কর্মকর্তা জানান, লেবানন সীমান্তে ইসরায়েলের অব্যাহত একতরফা সামরিক তৎপরতা নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছে তেহরান। এই আকস্মিক সংঘাতের জের ধরে শুক্রবারের জন্য পূর্বনির্ধারিত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মার্কিন-ইরান কূটনৈতিক বৈঠকটি সাময়িকভাবে স্থগিত বা বাতিল হয়ে গেছে।
এদিকে হিজবুল্লাহর এই সফল হামলার জবাবে বৃহস্পতিবার মধ্যরাত থেকে দক্ষিণ ও পূর্ব লেবাননের প্রায় ১০টি গ্রাম ও শহরের ৮০টিরও বেশি লক্ষ্যবস্তুতে নজিরবিহীন বিমান হামলা চালিয়েছে ইসরায়েলি বিমানবাহিনী। লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের প্রাথমিক বুলেটিন অনুযায়ী, ইসরায়েলের এই বিমান হামলায় অন্তত ১৮ জন লেবানিজ বেসামরিক নাগরিক ও হিজবুল্লাহ যোদ্ধা নিহত এবং ৩৩ জন আহত হয়েছেন। আইডিএফের দাবি, তারা হিজবুল্লাহর রকেট লঞ্চার প্যাড ও আন্ডারগ্রাউন্ড কমান্ড সেন্টার ধ্বংস করেছে। লেবাননের সরকারি পরিসংখ্যান বলছে, চলতি সামরিক সংঘাত শুরুর পর থেকে এ পর্যন্ত ইসরায়েলি হামলায় লেবাননে মোট ৩ হাজার ৭৮৩ জনেরও বেশি মানুষ নিহত এবং ১১ হাজার ৬৯৯ জনেরও বেশি আহত হয়েছেন। আগামী মঙ্গলবার পর্তুগালের ফুটবল ম্যাচের পর বিশ্ব ক্রীড়াঙ্গন যখন ব্যস্ত, ঠিক তখনই মধ্যপ্রাচ্যের এই নতুন উত্তেজনা বৈশ্বিক জ্বালানি তেলের বাজারকে আবারও অস্থিতিশীল করে তুলেছে।



