আন্তর্জাতিক ডেস্ক
ফিলিস্তিনের গাজায় গত দুই বছর ধরে চলা বিধ্বংসী যুদ্ধের পর ইসরায়েলি নাগরিকরা এখন এক গুরুতর মানসিক স্বাস্থ্য সংকটের মুখোমুখি। দীর্ঘ সংঘাত এবং মানসিক আঘাতের কারণে অনেক মানুষ হতাশা, উদ্বেগ, অনধিকারমূলক চিন্তাভাবনা এবং ক্লান্তির সঙ্গে লড়াই করছেন।
ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের দেওয়া গত বছরের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৫,২০০ সেনা পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিজঅর্ডার (পিটিএসডি) নিয়ে চিকিৎসা গ্রহণ করছেন। যুদ্ধের পরবর্তী সময়ে মোট ১২,০০০ সেনা হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য গেছেন, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানসিক সমস্যা ভুগছেন।

সম্প্রতি স্থানীয় গণমাধ্যমের বরাতে আনাদোলু জানিয়েছে, ইসরায়েলের প্রায় ২০ লাখ মানুষ মনস্তাত্ত্বিক সসমস্যায় ভুগছেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক সেনা সদস্য রয়েছেন।
২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৪ সালের শেষ পর্যন্ত প্রতি মাসে ‘দুর্ঘটনা-পরবর্তী মানসিক বৈকল্য’ বা পিটিএসডি (পোস্ট ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিস-অর্ডার) রোগ নির্ণয় ৭০ শতাংশ বেড়েছে। যার ফলে ২৩,৬০০ নতুন রোগী যুক্ত হয়েছে।
ইসরায়েলের বিখ্যাত গণমাধ্যম ইয়েদিওথ আহরোনোথের মতে, মাদকাসক্তির হার বৃদ্ধি এবং পরিবার ও সম্প্রদায় ভেঙে পড়ার কারণে ইসরায়েল ‘মানসিক স্বাস্থ্য সুনামির’ মুখোমুখি হচ্ছে। অন্তত বিশ লাখ ইসরায়েলির মানসিক চিকিৎসা সহায়তার প্রয়োজন।
গত শুক্রবার (২১ নভেম্বর) প্রকাশিত একটি বিস্তৃত প্রতিবেদনে সংবাদমাধ্যমটি বলেছে যে মানসিক স্বাস্থ্য পেশাদাররা ৭ অক্টোবর ২০২৩ সাল থেকে সহায়তার প্রয়োজন এমন মানুষের সংখ্যা তীব্রভাবে বৃদ্ধির বিষয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন। এরই মধ্যে থেরাপিস্ট এবং সহায়তা পরিষেবার তীব্র ঘাটতি দেখা দিয়েছে।

ইয়েদিওথ আহরোনোথের রিপোর্ট অনুযায়ী, গত ২০২৪ সালে বিষণ্নতা এবং উদ্বেগ রোগ নির্ণয় ২০১৩ সালের রেকর্ডের দ্বিগুণ ছিল। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, এর বিপর্যয়কর পরিণতি হতে পারে।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় অর্ধেক ইসরায়েলি এখন ক্রমাগত শোকের লক্ষণ প্রকাশ করছে। মানসিক স্বাস্থ্য হেল্পলাইনে ফোনের সংখ্যা ছয় গুণ বেড়েছে, যেখানে মানসিক ওষুধের ব্যবহার দ্বিগুণ হয়েছে।
যুদ্ধের সময় ঘুমের ব্যাধি ১৯ শতাংশ বেড়েছে। অন্যদিকে ইসরায়েলি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুসারে, ৭ অক্টোবর থেকে থেরাপি সেশনে ২৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। আর স্বল্পমেয়াদি সাইকোথেরাপির ঘটনা ৪৭১ শতাংশ বেড়েছে, যা ২০২২ সালে ৩,৫০০-এর তুলনায় ২০২৪ সালে ২০,০০০-এ পৌঁছেছে। তবে এই সংখ্যাগুলো শুধু প্রদত্ত চিকিৎসার প্রতিফলন ঘটায়। জোট সংগঠনগুলো বলছে যে বাস্তব পরিস্থিতি আরো অনেক গুরুতর।
হাইফা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মেরাভ রথ বলেন, ক্লিনিকগুলো শিশুদের মধ্যে বিষণ্নতা, উদ্বেগ, আসক্তি, বৈবাহিক সমস্যা এবং প্রতিকূল আচরণের তীব্র বৃদ্ধির কথা জানিয়েছে। রথ বলেন, বর্তমানে প্রতি চারজনের মধ্যে একজন আসক্তির ঝুঁকিতে রয়েছে।
ইসরায়েলি সাইকিয়াট্রিক অ্যাসোসিয়েশনের প্রধান ডা. মেরিনা কুপচিক সতর্ক করে বলেছেন, ‘যদি আমরা দেশের মানসিক পুনর্বাসনে বিনিয়োগ না করি, তাহলে দুই বা তিন বছরের মধ্যে আমাদের আরো বেশি মূল্য দিতে হবে।’



