ডেস্ক রিপোর্ট :
৭৫ বছর বয়সী এক নারী। নাম জনক পালতা। ১১ বছর ধরে কিছুই কেনেন না তিনি। যা কিছু প্রয়োজন, সব উৎপাদন করেন, নয়তো নিজে বানিয়ে ফেলেন। ভারতের মধ্যপ্রদেশের ইন্দোরের প্রত্যন্ত গ্রামের বাসিন্দা তিনি। তাঁর বাড়িটা বড়ই অদ্ভুত। বাড়ির চারপাশে বড় বড় জানালা। বাড়ির ছাদে, সামনের উঠানে সোলার প্যানেল আর উইন্ডমিল। আশপাশে মাঠ আর বাগান। সেখানেই ফলে নানা ধরনের শস্য, মসলা আর ফল। বাড়িটির মালিক ৭৫ বছর বয়সী জনক পালতা, যাঁকে বলা হচ্ছে ভারতের টেকসই জীবনযাপনের ‘অ্যাম্বাসেডর’।
তাঁর বাড়িতে সোলার কুকারে হয় রান্না। সোলার কিচেনে আছে ১৩টি সোলার কুকার। সেখানেই হয় এই বাড়ির ১১ জনের তিন বেলার রান্না। চাল, গম, ডাল, তেল, মসলা, ফল থেকে শুরু করে লেবু, গ্রিন–টি, পুদিনা, ধনিয়া, শর্ষে, রাই, মেথি, তুলসী, প্রয়োজনীয় ভেষজ ওষুধ—সবই উৎপাদন করেন। এমনকি কফি, চকলেট, মুড়ি, বিস্কুট, পাউরুটিও বানান তাঁরা। লেবুর খোসা আর রিঠার গুঁড়া দিয়ে পরিষ্কার করেন থালাবাসন। রিঠা পাউডার দিয়েই চলে জামাকাপড় কাচা। ব্যবহার করেন নিজেদের বানানো প্রাকৃতিক সাবান। দাঁত মাজেন নিমের ডাল দিয়ে। শরীরে মাখেন নিম ও শর্ষের তেল। মুখে মাখেন অ্যালোভেরার জেল। ফসল উৎপাদনে ব্যবহার করেন গোবর ও খাবারের খোসা থেকে তৈরি জৈব সার। এসব কাজে সহায়তার জন্য জনকের সাথে আছেন আরও ১০ নারী।

সংসার থেকে বিতাড়িত এই নারীদের বিভিন্ন সময়ে উদ্ধার করে কাজ শিখিয়েছেন জনক। এখন তাঁরা ১১ জন, কয়েকটি গরু, কুকুর, বিড়াল সবাই মিলেই থাকেন বাড়িটিতে।
বছরে ১৩ ধরনের ফসল ফলান জনক পালতা। ১৬০ প্রজাতির ফল আর ঔষধি গাছ আছে তাঁর বাগানে। কোনো উৎসের পানি বা কিছুই ফেলে দেন না। হাত ধোয়া পানি যায় পুদিনা, ধনিয়া ও মরিচগাছের গোড়ায়। গোসল, খাওয়ার, থালাবাসন বা কাপড় কাচার জন্য ব্যবহৃত পানি একটা নালার ভেতর দিয়ে পৌঁছে যায় বাগানে। অতিরিক্ত পানি প্রাকৃতিকভাবে পরিশোধিত হয়ে জমা হয়। বৃষ্টির পানিও ধরে রাখেন পরবর্তীতে ব্যবহার করার জন্য।
জনকের বাড়ির রাত আলোকিত হয় সোলার প্যানেল ও উইন্ডমিল থেকে উৎপন্ন বিদ্যুৎ দিয়ে। এমনকি জনকের উৎপাদিত বিদ্যুৎ থেকে যে উদ্বৃত্ত থাকে, তা ব্যবহার করছে ওই গ্রামের ৫০টি আদিবাসী পরিবার। ইন্টারনেট ব্যবহার করেন না জনক। তবে সকালবেলা এক কাপ চায়ের সঙ্গে কয়েকটি পত্রিকায় চোখ না বোলালে ভালো লাগে না তাঁর। পুরোনো পত্রিকাও বিদ্যুৎ তৈরিতে কাজে লাগান, বানান আসবাবও!

জানা যায়, ১৯৬৭ সালে মাত্র ১৭ বছর বয়সে একবার হার্ট অ্যাটাক হয়েছিল জনক পালতার। ওপেন হার্ট সার্জারি করতে হয়েছিল। সেবার জীবন–মৃত্যুর সন্ধিক্ষণ থেকে ফিরে জনক ঠিক করেছিলেন, যে কটা দিন বাঁচবেন, পৃথিবীর কোনো ক্ষতি করবেন না। সামাজিক কর্মকাণ্ডে নিজেকে বিলিয়ে দেবেন। ২০১১ সালে জীবনসঙ্গী জিমি ম্যাকগিলিয়ানের মৃত্যুর পর জনক তাঁর গ্রামে ফিরে যান আর টেকসই জীবনযাপন শুরু করেন। মূলত স্বামীর মৃত্যুর পর থেকেই তিনি আর কোনো পোশাক বা ব্যবহার্য জিনিস কেনা বন্ধ করে দেন। শেষ ১১ বছরে শুধু ওষুধ ছাড়া আর কিছুই কেনেননি। ছোটবেলা থেকেই প্লাস্টিকের ব্যবহার নিয়ে মানুষকে সচেতন করে আসছেন।
জনক পালতা ১৯৯২ সালে ব্রাজিলের রিও ডি জেনিরোতে অনুষ্ঠিত প্রথম আর্থ সামিটে অংশ নেন। সেখানে তাঁকে ‘টেকসই জীবনের রানি’ বলে সম্মান জানানো হয়। জনক জাতিসংঘের ‘টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা’র ভারতীয় অ্যাম্বাসেডর। ২০১৫ সালে ইউনাইটেড নেশনস এনভায়রনমেন্ট প্রোগ্রাম থেকে ‘গ্রিন হিরো’ উপাধি পেয়েছেন তিনি। পরিবেশ রক্ষা ও টেকসই জীবনযাপনের ক্ষেত্রে অসামান্য অবদান রাখায় একই বছর ভারত সরকার তাঁকে ‘পদ্মশ্রী’ পদকেও ভূষিত করে।
সূত্র: ‘জিন্দেগি উইথ রিচা’ ইউটিউব চ্যানেল ও ইন্ডিয়া টাইম



