নিজস্ব প্রতিবেদক
একটি দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা অনেকাংশেই নির্ভর করে তাদের প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর। যে দেশে প্রাকৃতিক সম্পদ যত বেশি, তাদের অর্থনৈতিক উন্নয়নে সম্ভাবনাও তত বেশি। তবে প্রাকৃতিক সম্পদ থাকলেই হবেনা, সেই সম্পদের সন্ধান পেতে হবে এবং তা সংগ্রহ করে সঠিকভাবে অর্থনৈতিক উন্নয়নে কাজে লাগাতে হবে।
আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারত ও মিয়ানমার, এমনকি পাকিস্তানও তাদের নিজ সমুদ্রসীমায় তৎপরতা চালিয়ে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি তেল ও গ্যাস আবিষ্কার করলেও বাংলাদেশ এক্ষেত্রে কোনো সাফল্য দেখাতে পারেনি।
বিশেষ করে প্রতিবেশী দুটি দেশের সঙ্গে সমুদ্রসীমা নিষ্পত্তির পর গত এক দশকে সাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নিতে পারেনি বাংলাদেশ। সর্বশেষ গত বছরের মার্চে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করলেও কোনো বিদেশী কোম্পানি সাড়া দেয়নি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সীমানা নিষ্পত্তির পর মিয়ানমার ও ভারত গভীর সমুদ্রে জ্বালানি অনুসন্ধানে ব্যাপক বিনিয়োগ করেছে। আর বাংলাদেশ সময়ক্ষেপণের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করেছে আমদানিনির্ভর জ্বালানি নীতি।
এমনকি গভীর সমুদ্রে জ্বালানি তেল ও গ্যাস অনুসন্ধানে আওয়ামী লীগ সরকারের ডাকা আন্তর্জাতিক দরপত্র অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে উন্মুক্ত করা হলেও কোনো বিদেশী কোম্পানির সাড়া দেয়নি। ফলে দেশের বিশাল সমুদ্র এলাকার সম্পদ এখনো অনাবিষ্কৃতই থেকে গেছে।

জানা যায়, বাংলাদেশে সমুদ্রে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান তৎপরতা দেখা যায় মূলত ২০০৮ সালের দিকে। উৎপাদন অংশীদারত্ব চুক্তি (পিএসসি) ২০০৮-এর আওতায় ২০১০ সালে গভীর সমুদ্রে দুটি ব্লকে কাজ নেয় মার্কিন কোম্পানি কনোকোফিলিপস। তারা দ্বিমাত্রিক জরিপও চালায়। কিন্তু গ্যাসের দাম বাড়ানোর দাবি পূরণ না হওয়ায় ২০১৫ সালে কাজ ছেড়ে চলে যায় কোম্পানিটি।
এরপর পিএসসি-২০১২-এর অধীনে ২০১৪ সালে অগভীর সমুদ্রের দুটি ব্লকে চুক্তি করে ভারতের ওএনজিসি ভিদেশ। আর দুটি ব্লকে চুক্তি করে অস্ট্রেলিয়ার স্যান্তোস ও সিঙ্গাপুরের ক্রিস এনার্জির সমন্বয়ে গঠিত যৌথ কোম্পানি। এ অঞ্চলে ব্যবসা গুটিয়ে নেয়ার কথা বলে ২০২০ সালে চলে যায় স্যান্তোস।
অন্যদিকে দরপত্র ছাড়াই বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) আইনের অধীনে ২০১৬ সালে সমুদ্রে দুটি ব্লকে গ্যাস অনুসন্ধানে চুক্তি করে দক্ষিণ কোরিয়ার পস্কো দাইয়ু। তারাও নির্ধারিত সময়ের আগে বাংলাদেশ ছেড়ে চলে যায়।
এরপর এক দশকের বেশি সময় দেশের সমুদ্র ব্লকগুলোতে বিদেশী কোম্পানিকে কাজ দেয়া যায়নি। বিশেষ করে দেশের গ্যাস সংকট শুরু হলে বিশ্ববাজার থেকে এলএনজি আমদানি করে ঘাটতি মেটানোর চেষ্টা করা হয়েছে। বিশেষ করে ২০১৮ সালের পর থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত অন্তত দেড় লাখ কোটি টাকার জ্বালানি পণ্যটি আমদানি করা হয়েছে।
সহজ পথে এলএনজি কিনতে গিয়ে দেশের সমুদ্র অংশে মনোযোগে অনীহা ছিল পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের। যে কারণে সাগরে দীর্ঘদিনের এ স্থবিরতা বিদেশী কোম্পানিগুলোকে আর বিনিয়োগ আকর্ষণ বাড়াতে পারেনি বলে মনে করেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক বদরূল ইমাম মনে করেন, বাংলাদেশে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা খুবই কম। বিশেষ করে গভীর সমুদ্রে এক ধরনের অনীহা দীর্ঘদিনের। এটা কাটিয়ে ওঠা জরুরি।

ভূতত্ত্ববিদ ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক বদরূল ইমাম বলেন, ‘সমুদ্রসীমা নির্ধারণ হওয়ার পর মিয়ানমার গ্যাস পেয়েছে। গভীর সমুদ্রে ভারত বিপুল পরিমাণ জ্বালানি তেল পাচ্ছে। দুটি জায়গার মাঝখানে বাংলাদেশের যে জলসীমা রয়েছে, সেখানে গ্যাস পাওয়া, বিদেশী কোম্পানিকে আকৃষ্ট করার মতো যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘যখন তারা (বিদেশী কোম্পানি) চাচ্ছে, তখন হয়তো আমরা তৎপরতা দেখাতে পারছি না। আমরা যখন প্রস্তুত হচ্ছি, তখন হয়তো তারা অন্য দেশে বিনিয়োগ করে ফেলছে।’
এ বিষয়ে পেট্রোবাংলার পরিচালক (পিএসসি) মো. শোয়েব বলেন, ‘সাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে ডাকা দরপত্রে কেন কোনো কোম্পানি অংশ নেয়নি, সে বিষয়গুলো রিভিউ করে আমরা জ্বালানি বিভাগে প্রতিবেদন দিয়েছি।
সুনির্দিষ্টভাবে সেখানে সমস্যাগুলো চিহ্নিত করা হয়েছে। মন্ত্রণালয় বিষয়গুলো যাচাই-বাছাই ও মতামত নিয়ে সিদ্ধান্ত দিলে আমরা দরপত্রে যাব। হয়তো এ বছরের মধ্যেই অফশোরে এ দরপত্র আহ্বান করা সম্ভব হবে।’
এ বিষযে জানতে চাইলে জ্বালানি সচিব মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘অফশোরে জ্বালানি তেল ও গ্যাস অনুসন্ধানে পুনরায় দরপত্র আহ্বানের প্রক্রিয়া চলছে। বিদেশী বিভিন্ন কোম্পানির সঙ্গে কথা বলে জানার চেষ্টা করা হয়েছে, কেন তারা দরপত্রে অংশ নেয়নি।
তিনি বলেন, ‘কোম্পানিগুলো তেল-গ্যাস উত্তোলনে কোম্পানির প্রফিট শেয়ার মার্জিন, জরিপের তথ্য-উপাত্তে ঘাটতি এবং তেল-গ্যাস কোম্পানির কর্মীদের প্রফিট ফান্ডের (ডব্লিউপিপিএফ) শেয়ারিং বিষয়গুলো উঠে এসেছে। এগুলো কতটুকু সংশোধন-পরিমার্জন করা যায়, তা নিয়ে কাজ করা হচ্ছে। খুব দ্রুতই এসব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে পুনরায় দরপত্রে যাওয়ার প্রস্তুতি নেয়া হবে।’



