― Advertisement ―

ভারতের সঙ্গে চুক্তির প্রতিবাদে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সামনে ছাত্র জোটের বিক্ষোভ

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফরে রেল কানেকটিভিটি বিষয়ে দুই দেশের মধ্যে সমঝোতা চুক্তির প্রতিবাদে পুলিশের বাধা অতিক্রম করে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সামনে বিক্ষোভ সমাবেশ করেছে...

গত পাঁচ মাসে নানা দাবিতে দেশে ১০১ আন্দোলন

ডেস্ক রিপোর্ট :

কে কখন কোথায় কোন দাবিতে সড়ক অবরোধ করে বসবেন বা বিক্ষোভ দেখাবেন, এমন একটা আশঙ্কা নিয়ে ঢাকাসহ দেশের বড় শহরগুলোর মানুষকে এখন চলাচল করতে হয়। প্রায় প্রতিদিনই কোনো না কোনো ব্যানারে ব্যস্ত সড়কে হাজির হচ্ছেন কেউ না কেউ। যাঁরা সড়ক অবরোধ করে আন্দোলন করছেন, তাঁদের বেশির ভাগই নিজেদের ‘বঞ্চিত’ বা ‘বৈষম্যের শিকার’ বলে দাবি করছেন।

কেউ সুনির্দিষ্ট ‘ব্যানার’ নিয়ে আন্দোলন করছেন, আবার কেউ ব্যানার ছাড়াই হঠাৎ সড়কে নেমে বিক্ষোভ করছেন। যেমন গত ২৬ আগস্ট সকালে হঠাৎ শাহবাগ এলাকার সড়ক অবরোধ করেন প্যাডেলচালিত শত শত রিকশাচালক। তাঁদের দাবি, ব্যাটারিচালিত রিকশা ঢাকার সড়কে চলতে পারবে না। সেদিন শাহবাগের পাশাপাশি ঢাকার আরও কিছু এলাকার সড়কে নেমেছিলেন প্যাডেলচালিত রিকশাচালকেরা। তবে ভিন্ন ভিন্ন জায়গায় নামলেও সুনির্দিষ্ট কোনো সংগঠনের ব্যানারে তাঁরা সেদিন জড়ো হননি। যে যাঁর মতো করে এলেও ব্যাটারিচালিত রিকশা চলতে পারবে না ঢাকায়, এটিই ছিল তাদের মূল দাবি।

এ ঘটনার আড়াই মাস পর গত ১৯ নভেম্বর হাইকোর্টের এক নির্দেশনার বিরোধিতা করে ঢাকার রাজপথে আন্দোলনে নামেন ব্যাটারিচালিত রিকশাচালকেরা। তাঁরা ঢাকার বিভিন্ন এলাকার সড়ক অবরোধ করে শুরু করেন আন্দোলন। ওই আন্দোলনের মধ্যে ২১ নভেম্বর ঢাকার মহাখালীতে ব্যাটারিচালিত রিকশাচালকদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ব্যাপক সংঘর্ষ হয়। শেষ পর্যন্ত ব্যাটারিচালিত রিকশাচালকেরা অবশ্য সফল হয়েছেন। রাজধানী ঢাকার মূল সড়কগুলো বাদে অলিগলির সড়কে চলাচলের অনুমতি আদায় করতে সক্ষম হয়েছেন তাঁরা। যদিও মূল সড়কেও এখন ব্যাটারিচালিত রিকশা অহরহ চলতে দেখা যাচ্ছে।

সাম্প্রতিক সময়ের কথা বললে, সড়ক অবরোধের ঘটনা গতকাল রোববারও ঘটেছে রাজধানী ঢাকায়। দুপুরের দিকে হঠাৎ মগবাজার মোড়ের কাছে অফিসার্স ক্লাব–সংলগ্ন প্রধান সড়ক অবরোধ করেন ঢাকা জেলায় (রাজধানীর বাইরে) চলাচলের নিবন্ধন পাওয়া সিএনজিচালিত অটোরিকশার মালিক ও চালকেরা। এতে দুর্ভোগে পড়ে মানুষ।

অবরোধকারীদের দাবি, ঢাকা জেলায় চলাচলের জন্য নিবন্ধিত অটোরিকশাও রাজধানীর সড়কে চলাচলের সুযোগ দিতে হবে। প্রায় এক ঘণ্টা অবরোধের পর সড়ক ছেড়ে যান তাঁরা। ঢাকা জেলা সিএনজি অটোরিকশা মালিক-শ্রমিক কল্যাণ সোসাইটির ব্যানারে এই কর্মসূচি পালন করে তারা। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে গত ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর একের পর এক যৌক্তিক বা অযৌক্তিক দাবিতে অনেক পেশাজীবী সংগঠন, শিক্ষার্থী, শ্রমিকসহ বিভিন্ন শ্রেণি ও পেশার মানুষ আন্দোলন শুরু করেছেন। তাঁরা সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ-আন্দোলন করায় ঢাকার যানজট আরও তীব্র হচ্ছে, মানুষের ভোগান্তি-কষ্ট বাড়ছে। সরকারি কাজেও ব্যাঘাত ঘটছে।

ছোট-বড় মিলিয়ে এখন পর্যন্ত গত ৫ মাসে অন্তত ১০১টি আন্দোলনের তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে অনেক সংগঠন ও গোষ্ঠীর আন্দোলন এখনো চলমান। এমন অনেক সংগঠনের ব্যানারেও আন্দোলন হচ্ছে, যেসব সংগঠনের কোনো অস্তিত্বই ছিল না। শুধু দাবি জানানোর জন্য বেশ কিছু সংগঠনের জন্ম হয়েছে। আবার কেউ কেউ কোনো ব্যানার বা সংগঠন ছাড়াই আন্দোলনে নেমে পড়ছেন।

আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর গত ৮ আগস্ট অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়। তখন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ছিল অনেকটাই নাজুক। বিপর্যস্ত অবস্থায় দায়িত্ব নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকার যখন কিছুটা গুছিয়ে ওঠার চেষ্টা করছে, তখন একের পর এক যৌক্তিক-অযৌক্তিক আন্দোলন শুরু হওয়ায় সরকারের ওপর চাপ বাড়ে যায়। এই পরিস্থিতি এখনো অনেকটাই চলমান রয়েছে।

অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের পর প্রথম দিকে আন্দোলনকারীরা নানা দাবি নিয়ে জড়ো হতেন প্রধান উপদেষ্টার বাসভবন যমুনার (রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন) সামনে। এর পাশাপাশি বিভিন্ন আন্দোলনকারীদের আরেকটি ‘পছন্দের’ জায়গা হয়ে ওঠে শাহবাগ। নিষেধাজ্ঞার কারণে যমুনার সামনে এখন কেউ কর্মসূচি পালন করতে পারছেন না। ফলে শাহবাগের ওপর ‘চাপ’ বেড়েছে। এর আগে কখনো কখনো যমুনার সামনে একসঙ্গে পাঁচ-ছয়টি সংগঠনও নানা দাবিতে বিক্ষোভ করেছে।

গত আগস্টের মাঝামাঝি সময়ে দিনে ১৪-১৫টি সংগঠনও রাজপথে নানা দাবিতে আন্দোলন শুরু করে। যেমন ১৯ আগস্ট ঢাকার বিভিন্ন সড়কের মোড়ে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করে অন্তত ১৭টি সংগঠন। কারও দাবি চাকরি স্থায়ীকরণ, কেউ চায় দুর্নীতি রোধ, কেউবা বৈষম্যের ‘শিকার’, আবার কেউ ‘বঞ্চিত’ দাবি করে সেদিন সড়কে নেমেছিলেন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। উত্তরা, শাহবাগ, মিরপুর রোড, প্রেসক্লাব, সচিবালয়, রামপুরা, কাকরাইলসহ বিভিন্ন এলাকার সড়ক আটকে সেদিন বিক্ষোভ করা হয়েছিল। এর মধ্যে যমুনার সামনে সড়ক অবরোধ করে মানববন্ধন করেছিলেন ‘তথ্য আপা’ প্রকল্পের নারীরা। সেদিন নানা আন্দোলনকারীর ভিড়ে বিডিআর থেকে চাকরিচ্যুত সদস্যদের একটি দল প্রেসক্লাবের সামনে জায়গা না পেয়ে এর বিপরীত পাশে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ভবনের সামনে গিয়ে দাঁড়ায়।


এমন পরিস্থিতিতে ২৫ আগস্ট জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস সবার সহযোগিতা চেয়ে বলেছিলেন, ‘দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে প্রতিদিন সচিবালয়ে, আমার অফিসের আশপাশে, শহরের বিভিন্ন স্থানে সমাবেশ করা হচ্ছে। গত ১৬ বছরের অনেক দুঃখ-কষ্ট আপনাদের জমা আছে। সেটা আমরা বুঝি। আমাদের যদি কাজ করতে না দেন, তাহলে এই দুঃখ ঘোচানোর সকল পথ বন্ধ হয়ে থাকবে। আপনাদের কাছে অনুরোধ, আমাদের কাজ করতে দিন। আপনাদের যা চাওয়া, লিখিতভাবে আমাদের দিয়ে যান। আমরা আপনাদের বিপক্ষ দল নই। আইনসংগতভাবে যা কিছু করার, আমরা অবশ্যই করব। কিন্তু আমাদের ঘেরাও করে কাজে বাধা দেবেন না।’

নানা নামে নানা সংগঠনের আন্দোলনের বিষয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের আইন উপদেষ্টা অধ্যাপক আসিফ নজরুল ২৮ ডিসেম্বর ঢাকায় এক অনুষ্ঠানে বলেছিলেন, বিভিন্ন ধরনের দাবি নিয়েই মানুষ আসছে। কেউ পদোন্নতিবঞ্চিত, বেতনবঞ্চিত, কাউকে খারাপ জায়গায় বদলি করা হয়েছে, কারও বেতন বাড়াতে হবে, কাউকে রাজস্ব খাতে নিতে হবে। সবকিছু ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর দাবিদাওয়াকেন্দ্রিক। রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান নির্মাণের প্রস্তাব নিয়ে কেউ আসে না। মন্ত্রণালয়ের ৩০ শতাংশ সময় ব্যক্তিগত এসব বিষয়ে ব্যয় হয় উল্লেখ করে আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল আরও বলেছিলেন, ‘কত রকম যে বঞ্চিত। যাকে আমি সারা জীবন জানতাম আওয়ামী লীগের সুবিধাভোগী, সে-ও এসে কেঁদে দেয়—আমিও বঞ্চিত।’

পেশাজীবীদের ব্যানারে আন্দোলনে নামা সংগঠনগুলোর মধ্যে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন, রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর ১১ দফা আন্দোলন, রেলওয়ে গেটম্যানদের চাকরি স্থায়ীকরণ আন্দোলন, বৈষম্যবিরোধী গ্রাম-পুলিশ সমন্বয় কমিটি, বাংলাদেশ সচিবালয় বৈষম্যবিরোধী কর্মচারী সংগঠন, ইউনিয়ন ও পৌরসভা ডিজিটাল সেন্টার পরিচালক সমন্বয় পরিষদ, বৈষম্যবিরোধী জাতীয়করণকৃত প্রাথমিক শিক্ষক সমন্বয় পরিষদ, বাংলাদেশ সরকারি কর্মচারী দাবি আদায় ঐক্য পরিষদ, বাংলাদেশ প্রশাসনিক কর্মকর্তা বাস্তবায়ন ঐক্য পরিষদ, বাংলাদেশ সরকারি কর্মচারী সমন্বয় পরিষদ, বৈষম্যবিরোধী সার্ভে ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স ছাত্র পেশাজীবী অধিকার বাস্তবায়ন পরিষদ, বৈষম্যবিরোধী প্রাথমিক শিক্ষক সমন্বয় পরিষদ বাংলাদেশ, মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার কল্যাণ সমিতি ও বাংলাদেশ মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারী কল্যাণ সমিতি, স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদ্রাসা শিক্ষক সমন্বয় কমিটি, ডেলটা লাইফ ইনস্যুরেন্স বৈষম্যের শিকার কর্মকর্তা-কর্মচারীবৃন্দ, বাংলাদেশ বেসরকারি কলেজ ও অনার্স-মাস্টার্স শিক্ষক ফেডারেশন অন্যতম।

পোশাক কারখানার শ্রমিকেরাও বিভিন্ন দাবিতে আন্দোলনে নেমেছেন। মজুরি বাড়ানোর দাবিতে চা-শ্রমিকেরাও আন্দোলনে আছেন। সংখ্যালঘু নির্যাতন বন্ধের দাবিতে সম্মিলিত সংখ্যালঘু জোটের আন্দোলন এখনো চলমান। একই দাবিতে আরও কয়েকটি পক্ষ আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে। চট্টগ্রামে বাংলাদেশ সম্মিলিত সনাতনী জাগরণ জোটের মুখপাত্র চিন্ময় কৃষ্ণ দাস ব্রহ্মচারীর মুক্তির দাবিতে আন্দোলনের সময় তাঁর অনুসারীদের সঙ্গে সংঘর্ষের সময় এক আইনজীবী নিহত হওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।
নানা দাবিতে আন্দোলনের বিষয়ে জানতে চাইলে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক আল মাসুদ হাসানুজ্জামান বলেন, কর্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থায় নানা সীমাবদ্ধতার কারণে যৌক্তিক দাবিও অনেকে প্রকাশ করতে পারেননি। গণ-অভ্যুত্থানের পর তাঁরা মনে করলেন, দাবি প্রকাশের একটি সুযোগ এসেছে। এখন সেটি তাঁরা কাজে লাগাচ্ছেন। তবে অনেক অযৌক্তিক আন্দোলনও হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে কারও কারও আন্দোলনের পেছনে ষড়যন্ত্র থাকতে পারে। আবার সরকারকে বিব্রত করতে কেউ কেউ আন্দোলন করছে বলেও অনেকে মনে করছেন।