মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক ইতিহাসে এক নজিরবিহীন ও গোপন সমীকরণের তথ্য প্রকাশ্যে এসেছে। সম্প্রতি শেষ হওয়া ইরান যুদ্ধ চলাকালে সংযুক্ত আরব আমিরাতে নিজেদের সেনা ও বিখ্যাত ‘আয়রন ডোম’ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা পাঠানোর বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেছে তেল আবিব। ইসরায়েলের পরিবহনমন্ত্রী মিরি রেগেভ এই চাঞ্চল্যকর সামরিক সহযোগিতার তথ্য নিশ্চিত করেছেন বলে জানিয়েছে দেশটির প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম জেরুজালেম পোস্ট।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম ‘এক্সিওস’ প্রথম এই স্পর্শকাতর সামরিক মোতায়েনের খবরটি বিশ্বমঞ্চে ফাঁস করে। পরবর্তীতে মার্কিন গণমাধ্যম সিএনএন-এর কাছেও ইসরায়েলের নির্ভরযোগ্য সরকারি সূত্রগুলো এই খবরের সত্যতা স্বীকার করেছে। ২০২০ সালে ঐতিহাসিক ‘আব্রাহাম অ্যাকর্ডস’-এর মাধ্যমে ইসরায়েল ও আরব আমিরাতের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্বাভাবিক হলেও, দুই দেশের মধ্যে এমন প্রত্যক্ষ সামরিক ও যুদ্ধকালীন সহযোগিতা এই প্রথম।
ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্যমতে, যুদ্ধ চলাকালীন প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ বিন জায়েদের (এমবিজেড) সঙ্গে এক জরুরি টেলিফোনলাপে অংশ নেন। সেই আলাপের পরপরই আমিরাতের আকাশসীমা সুরক্ষায় জরুরি ভিত্তিতে আয়রন ডোম ব্যাটারি এবং ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্র পাঠানোর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয় ইসরায়েল।
উপসাগরীয় দেশ আরব আমিরাতের দিকে যুদ্ধ চলাকালীন ইরান যে কয়েক ডজন মারাত্মক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছিল, সেগুলো এই যৌথ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমেই মাঝআকাশে সফলভাবে ভূপাতিত করা হয়। এর মাধ্যমে ইতিহাসে প্রথমবারের মতো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ভৌগোলিক সীমান্তের বাইরে সম্পূর্ণ ভিন্ন কোনো দেশের বাস্তব যুদ্ধক্ষেত্রে আয়রন ডোমের সরাসরি ব্যবহার রেকর্ড করা হলো।
এর আগে কেবল সিঙ্গাপুর ও রোমানিয়ার মতো দেশগুলো ইসরায়েল থেকে এই প্রযুক্তি কেনার প্রক্রিয়ায় যুক্ত থাকলেও কোনো যুদ্ধক্ষেত্রে ইসরায়েলি সেনাসহ এর সক্রিয় মোতায়েন দেখা যায়নি। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ শুরু হয়েছিল, তা দ্রুতই পুরো উপসাগরীয় অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে এবং দীর্ঘ ছয় সপ্তাহ পর গত ৮ এপ্রিল থেকে একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি চলছে।
আরব আমিরাতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের দেওয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী, যুদ্ধের সময় উপসাগরীয় অঞ্চলের অন্য যেকোনো দেশের তুলনায়—এমনকি খোদ ইসরায়েলের চেয়েও—তারা বেশি মাত্রায় ইরানের আকাশ হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়েছিল। আমিরাতের দাবি, তাদের ভূখণ্ডে ইরান ৫৫০টিরও বেশি ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র এবং ২ হাজার ২০০টির বেশি ড্রোন দিয়ে একযোগে ঝাঁঝালো হামলা চালিয়েছিল।
যদিও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার কারণে তারা ৯০ শতাংশের বেশি হামলা আকাশেই প্রতিহত করতে সক্ষম হয়, তবুও কিছু ক্ষেপণাস্ত্র আমিরাতের সামরিক ও বেসামরিক স্থাপনায় আঘাত হানতে সক্ষম হয়েছিল। মূলত রকেট, মর্টার ও ড্রোন ধ্বংস করতে সক্ষম ইসরায়েলের তৈরি এই ভ্রাম্যমাণ ও স্বল্পপাল্লার আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাটিই চরম সংকটের দিনে আমিরাতের আকাশকে সুরক্ষিত রাখতে ঢাল হিসেবে কাজ করেছে।



