তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বর্তমান বিএনপি সরকার ক্ষমতার প্রায় ছয় মাস অতিক্রম করতে চলেছে। একটি নতুন নির্বাচিত রাজনৈতিক সরকারের সার্বিক পারফরম্যান্স মূল্যায়নের জন্য ছয় মাস বেশ সংক্ষিপ্ত সময়। তা সত্ত্বেও কর্মসংস্থান সৃষ্টি, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, ব্যাংকিং খাতের সংস্কার, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি রক্ষা এবং জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতের মতো বহুমুখী চাপ এখন সরকারের কাঁধে। দেশের অর্থনীতিবিদ, ব্যবসায়ী নেতা ও নীতি নির্ধারকরা মনে করছেন, পূর্ববর্তী সরকারের রেখে যাওয়া অর্থনৈতিক বিশৃঙ্খলা কাটিয়ে ওঠাই এখন সরকারের মূল অগ্রাধিকার।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের একজন অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক জানান, বিগত সরকারের দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদ বিদেশে পাচারের কারণে দেশের অর্থনীতিতে গভীর সংকট তৈরি হয়েছে। গত ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ অনুষ্ঠিত এক জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে সরকার গঠন করে। এর আগে অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার প্রায় ১৮ মাস দেশ সংস্কারের দায়িত্ব পালন শেষে এই অবাধ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন সম্পন্ন করে। শেখ হাসিনা ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পর যে ভঙ্গুর অর্থনৈতিক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল, তা থেকে উত্তরণে জনগণের কিছুটা ধৈর্যের প্রয়োজন বলে তিনি উল্লেখ করেন।
দেশের শিল্পখাত বর্তমানে তীব্র জ্বালানি সংকটের মুখোমুখি। গ্রীষ্মের তৈরি তীব্র দাবদাহের মধ্যে ঘন ঘন লোডশেডিং এবং বিদ্যুৎ ঘাটতির কারণে পোশাকসহ রপ্তানিমুখী কারখানাগুলোতে উৎপাদন ব্যাপকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। বুয়েটের কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. ইজাজ হোসেন বলেন, অতীতে জ্বালানি খাতে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার অভাব এবং আমদানিনির্ভরতার কারণে আজ এই সংকট চরম রূপ নিয়েছে। তিনি জানান, বঙ্গোপসাগরে সীমানা জয়ের পর সেখানে অফশোর গ্যাস অনুসন্ধানে মার্কিন বিনিয়োগ আকর্ষণে অতীতের সরকার ব্যর্থ হয়েছিল। বর্তমানে বিদ্যুৎ, এলএনজি ও জ্বালানি আমদানিতে বাংলাদেশকে বছরে প্রায় ৫.৭ বিলিয়ন ডলার খরচ করতে হচ্ছে।
অর্থনৈতিক এই মন্দার মধ্যে পাচার হওয়া অর্থ উদ্ধার করা সরকারের জন্য বড় পরীক্ষা। পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)-র ধারণা অনুযায়ী, গত ১৫ বছরে ব্যবসায়ী ও রাজনীতিবিদদের যোগসাজশে প্রায় ২০০ বিলিয়ন ডলার বিদেশে পাচার হয়েছে। এক ব্যাংকিং বিশেষজ্ঞ জানান, বৈশ্বিক নিয়মে পাচারকৃত অর্থ উদ্ধারের হার মাত্র ৫ থেকে ১০ শতাংশ, যা ফেরত আনতে সর্বনিম্ন ৫-৬ বছর সময় লাগে। সুতরাং বিএনপির বাকি সাড়ে চার বছর মেয়াদে এই অর্থ উদ্ধার একটি বিশাল চ্যালেঞ্জ হয়ে থাকবে।
কর্মসংস্থান বাড়াতে বছরে ২০ লাখ তরুণের জন্য বাজারমুখী শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলার তাগিদ দিয়েছেন বাংলাদেশ চেম্বার অফ ইন্ডাস্ট্রিজের (বিসিআই) সভাপতি আনোয়ারুল ইসলাম পারভেজ। একইসঙ্গে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নূর সংসদে জানান, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ১৪ লাখ কর্মী বিদেশে পাঠানোর লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে, যেখানে ইতিপূর্বে ২০২৫ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের মে পর্যন্ত সাড়ে ৯ লাখের বেশি কর্মী বিদেশে গেছেন। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সাথে ইরানের চলমান সংঘাত মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজারকে কিছুটা ব্যাহত করলেও বাণিজ্য কূটনীতি জোরদার করা হচ্ছে।
এদিকে এডিবি (Asian Development Bank) এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের ভাইস প্রেসিডেন্ট ইয়িংমিং ইয়াং সম্প্রতি ঢাকা সফর শেষ করে বার্ষিক ১ বিলিয়ন ডলারের বেশি ঋণ সহযোগিতার ইঙ্গিত দিয়েছেন। পাশাপাশি জাতিসংঘের ইউএনসিটিএডি (UNCTAD) ওয়ার্ল্ড ইনভেস্টমেন্ট রিপোর্ট ২০২৬ অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বাংলাদেশে বৈদেশিক প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ (FDI) ৪৫ শতাংশ বেড়ে ১.৭৮ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। সব মিলিয়ে শিল্প সুরক্ষা, আইনশৃঙ্খলা পুনরুদ্ধার এবং ব্যবসায় পরিবেশ স্বাভাবিক রাখতে পারলেই অর্থনীতি গতি ফিরে পাবে বলে ধারণা করছেন খাত সংশ্লিষ্টরা।



