ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকায় চলমান পদ্ধতিগত গণহত্যায় ইসরায়েলি বাহিনী সম্পূর্ণ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও নিয়মতান্ত্রিকভাবে শিশুদের নিশানা (Targeting) করছে বলে জাতিসংঘের একটি স্বাধীন আন্তর্জাতিক অনুসন্ধান কমিশনের নতুন প্রতিবেদনে অত্যন্ত ভয়ংকর তথ্য উঠে এসেছে। গত মঙ্গলবার (২৩ জুন, ২০২৬) প্রকাশিত এই বিশেষ প্রতিবেদনে কমিশন উল্লেখ করেছে যে, ইসরায়েলের সুদূরপ্রসারী সামরিক কৌশলের কারণে গাজার ফিলিস্তিনি শিশুরা বর্তমানে নজিরবিহীন মৃত্যু, পঙ্গুত্ব এবং দীর্ঘমেয়াদি মানসিক ট্রমার (Mental Trauma) মুখোমুখি হচ্ছে। গত বছরই এই কমিশন গাজায় ইসরায়েলের কর্মকাণ্ডকে ‘গণহত্যা’ বা জেনোসাইড হিসেবে সাব্যস্ত করেছিল; আর এবার শিশুদের ওপর এই পরিকল্পিত হামলাকে তারা ফিলিস্তিনি জাতিকে সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন বা নির্মূল করার চূড়ান্ত উদ্দেশ্য (Genocidal Intent) হিসেবে আখ্যা দিয়েছে।
অনুসন্ধান কমিশনের চেয়ারম্যান শ্রীনিবাসন মুরলিধর আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, ২০২৫ সালের অক্টোবরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় গাজায় তথাকথিত একটি যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পরেও ফিলিস্তিনি শিশুদের সুরক্ষাসংক্রান্ত আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনকে ক্রমাগত বুড়ো আঙুল দেখাচ্ছে তেল আবিব। যুদ্ধবিরতির পরবর্তী ৮ মাসেও গাজায় ইসরায়েলের নির্বিচার বিমান হামলায় ২৫০ জনেরও বেশি শিশুসহ অন্তত এক হাজার ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। কমিশন গাজার হাসপাতাল, স্বাস্থ্য ক্লিনিক ও প্রজনন কেন্দ্রগুলোতে ইসরায়েলের নিয়মতান্ত্রিক বিমান ও আর্টিলারি হামলার একটি নিখুঁত চিত্র নথিবদ্ধ করেছে, যার মূল উদ্দেশ্য ছিল ফিলিস্তিনি শিশুদের দীর্ঘমেয়াদি বিকাশ ও প্রজনন স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে স্থায়ীভাবে পঙ্গু করে দেওয়া।
রিপোর্টে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শান্তি পরিকল্পনার (Trump Peace Plan) চরম ব্যর্থতার চিত্র তুলে ধরে বলা হয়, গাজা থেকে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহারের শর্ত থাকলেও প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু উল্টো সামরিক দখলদারি বৃদ্ধি করে বর্তমানে গাজার ৭০ শতাংশ এলাকা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়েছেন। যুদ্ধবিরতির পর ইসরায়েল প্রথমে মানচিত্রে একটি সাময়িক ‘হলুদ রেখা’ (Yellow Line) দিয়ে দখলি এলাকা চিহ্নিত করলেও, সেই সীমান্ত ক্রমাগত ফিলিস্তিনিদের ভূখণ্ডের দিকে চেপে বসছে। বর্তমানে আগের হলুদ রেখা পেরিয়ে নতুন জমি গ্রাসের জন্য একটি ‘কমলা রেখা’ (Orange Line) মানচিত্র তৈরি করেছে আইডিএফ, যা অতিক্রম করলেই শিশুদের দেখামাত্র গুলির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এই চলনশীল রেখার বিভ্রান্তির কারণে প্রতিনিয়ত শত শত শিশু নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার হচ্ছে।
শুধু গাজাই নয়, অধিকৃত পশ্চিম তীর (West Bank) ও পূর্ব জেরুজালেমেও ইসরায়েলি উগ্র বসতিস্থাপনকারী (Settlers) এবং সামরিক বাহিনীর যৌথ বর্বরতায় ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে এ পর্যন্ত ২৩৬ জন ফিলিস্তিনি শিশু নিহত হয়েছে। তবে ইসরায়েলের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং জাতিসংঘে নিযুক্ত ইসরায়েলি রাষ্ট্রদূত ড্যানি ড্যানন এই আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনকে ‘আপত্তিকর প্রোপাগান্ডা’ ও ‘রাজনৈতিক রক্তপাত’ আখ্যা দিয়ে সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান করেছেন। অন্যদিকে, ফিলিস্তিনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একে স্বাগত জানিয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (ICC) কর্তৃক ওয়ান্টেড ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের অবিলম্বে গ্রেপ্তার এবং ইসরায়েলে বৈশ্বিক অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা জারির জন্য সদস্য রাষ্ট্রগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়েছে।



