― Advertisement ―

মার্কিন-ইরান চুক্তি ভেস্তে দিতে পারেন নেতানিয়াহু: ট্রাম্প প্রশাসনকে মার্কিন গোয়েন্দাদের জরুরি সতর্কবার্তা

লেবাননে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর (IDF) নৃশংস সামরিক অভিযানকে কেন্দ্র করে হোয়াইট হাউস ও তেল আবিবের মধ্যে পর্দার আড়ালে নজিরবিহীন কূটনৈতিক টানাপোড়েন এবং সম্পর্কের মারাত্মক অবনতি ঘটেছে। এই তীব্র উত্তেজনার আবহেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জনসমক্ষে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ভূয়সী প্রশংসা করে তাঁকে একজন ‘যোদ্ধা প্রধানমন্ত্রী’ (Warrior Prime Minister) হিসেবে অভিহিত করেছেন। কাতার থেকে ওয়াশিংটনের উপহার হিসেবে পাওয়া নতুন ‘এয়ার ফোর্স ওয়ান’ প্রেসিডেন্সিয়াল বিমানের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ট্রাম্প দাবি করেন, মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের বিরুদ্ধে ওয়াশিংটন ও তেল আবিব অত্যন্ত সুদৃঢ়ভাবে যৌথ লড়াই পরিচালনা করছে। তবে হোয়াইট হাউসের এই প্রকাশ্য রাজনৈতিক সৌহার্দ্যের সমান্তরালে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো (IC) ট্রাম্প প্রশাসনকে এক জরুরি গোপন ডকেট পাঠিয়ে সতর্ক করেছে যে, রাজনৈতিক অস্তিত্বের স্বার্থে নেতানিয়াহু যেকোনো মুহূর্তে মার্কিন-ইরান ঐতিহাসিক শান্তি চুক্তিটি সম্পূর্ণ নস্যাৎ করে দিতে পারেন।

মার্কিন প্রভাবশালী দৈনিক ‘দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট’ বর্তমান ও সাবেক কর্মকর্তাদের উদ্বৃতি দিয়ে জানিয়েছে, পেন্টাগন ও সিআইএ-র (CIA) সাম্প্রতিক গোয়েন্দা মূল্যায়নে দেখা গেছে—নেতানিয়াহু প্রশাসন তেহরানের সঙ্গে সম্পাদিত শান্তি চুক্তির শর্তাবলি নিয়ে চরম অসন্তুষ্ট। ইসরায়েলের দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত লক্ষ্য ছিল ইরানের ওপর ‘সর্বোচ্চ চাপ’ (Maximum Pressure) বজায় রাখা, যা ট্রাম্পের এই নতুন সমঝোতার কারণে ব্যাহত হচ্ছে। গোয়েন্দা প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি ২০২৬ সালের শেষের দিকে ইসরায়েলে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। ফলে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক মেরুকরণে টিকে থাকতে এবং নিজের ভঙ্গুর জনপ্রিয়তা পুনরুদ্ধার করতে নেতানিয়াহু ভোটারদের এটিই বোঝাতে চাইবেন যে, তিনি লেবানন থেকে সেনা প্রত্যাহার করবেন না এবং ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে লড়াই আরও তীব্র করবেন। এই রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতার কারণে তিনি এমন কিছু উগ্র সামরিক পদক্ষেপ নিতে পারেন, যা ওয়াশিংটন-তেহরান শান্তি প্রক্রিয়াকে স্থায়ীভাবে ঝুঁকির মুখে ফেলবে।

প্রকাশ্যে প্রশংসা করলেও মার্কিন সংবাদমাধ্যম ‘অ্যাক্সিওস’ (Axios)-কে দেওয়া একটি একান্ত সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প স্বীকার করেছেন যে, নেতানিয়াহুর সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখার ক্ষেত্রে অত্যন্ত সতর্ক মনস্তাত্ত্বিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবহার করতে হচ্ছে। গত ১ জুনের একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল ও গোপন ফোনালাপের বিবরণ টেনে অ্যাক্সিওস জানায়, লেবাননে ইসরায়েলি হামলার কারণে ইরান যখন একপর্যায়ে শান্তি আলোচনা স্থগিত করার হুমকি দিয়েছিল, তখন ট্রাম্প ফোনে নেতানিয়াহুর ওপর মারাত্মকভাবে ক্ষিপ্ত হন। ক্ষুব্ধ ট্রাম্প ফোনে চিৎকার করে নেতানিয়াহুকে বলেছিলেন, “তুমি তো পুরোপুরি পাগল হয়ে গেছ! আমি হোয়াইট হাউসে না থাকলে তুমি এত দিনে জেলে থাকতে; আমি তোমার পিঠ বাঁচাচ্ছি। কিন্তু তোমার এই হঠকারী আচরণের কারণে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এখন সবাই তোমাকে এবং ইসরায়েলকে তীব্র ঘৃণা করছে।” এই ফোনালাপ থেকে স্পষ্ট যে, মধ্যপ্রাচ্য নীতিতে ট্রাম্প তেল আবিবের ওপর নিজের নিরঙ্কুশ আধিপত্য বজায় রাখতে চান।

তবে এই তীব্র ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যেই কাতার ও মার্কিন মধ্যস্থতাকারীদের নিবিড় ব্যাকচ্যানেল কূটনীতির (Backchannel Diplomacy) পর শুক্রবার ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহ একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঐতিহাসিক মার্কিন-ইরান শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরের মাত্র ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে লেবাননে পুনরায় ইসরায়েলি বিমান হামলা শুরু হওয়ায় পুরো আন্তর্জাতিক শান্তি আলোচনা চরম হুমকির মুখে পড়েছিল। যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত ইসরায়েলের রাষ্ট্রদূত ইয়েচিয়েল লেইটার দাবি করেছেন, তেল আবিব যুদ্ধবিরতি কার্যকর করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, তবে শর্ত হলো হিজবুল্লাহকে শত্রুতা সম্পূর্ণ বন্ধ করতে হবে। এর আগে গত এপ্রিলেও একটি অনুরূপ যুদ্ধবিরতি চুক্তি স্বাক্ষরিত হলেও ইসরায়েল তা লঙ্ঘন করে লেবাননে সামরিক অভিযান অব্যাহত রেখেছিল, যা এবারের যুদ্ধবিরতির স্থায়িত্ব নিয়েও আন্তর্জাতিক মহলে গভীর সংশয় তৈরি করেছে।