― Advertisement ―

মার্কিন-ইরান শান্তি চুক্তির পরও বিশ্ববাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ৮০ ডলার ছাড়াল; নেপথ্যে লেবানন সংঘাত

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের অবসান ঘটাতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি ঐতিহাসিক ও বহুল প্রত্যাশিত শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়া সত্ত্বেও বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের বাজার স্থিতিশীল হওয়ার বদলে উল্টো ঊর্ধ্বমুখী রূপ ধারণ করেছে। দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলি বাহিনীর নতুন বিমান হামলা ও তার জবাবে হিজবুল্লাহর পাল্টা আক্রমণে ইসরায়েলি সেনা নিহতের ঘটনা এই চুক্তির দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্বকে বড় ধরনের অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে। একই সঙ্গে সুইজারল্যান্ডে দুই দেশের মধ্যকার পরবর্তী উচ্চপর্যায়ের দ্বিপাক্ষিক নীতি-নির্ধারণী বৈঠক আকস্মিক বাতিল হওয়ায় বৈশ্বিক এনার্জি মার্কেটে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। শুক্রবার (১৯ জুন, ২০২৬) কাতারভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার এক বিশেষ অর্থনৈতিক প্রতিবেদনে এই অস্থিতিশীল পরিস্থিতির চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।

আন্তর্জাতিক কমোডিটি মার্কেটে শুক্রবার লেনদেন শুরুর প্রথম প্রহরে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের বেঞ্চমার্ক ‘ব্রেন্ট ক্রুড’-এর দাম প্রায় ০.৯ শতাংশ হ্রাস পেয়েছিল। কিন্তু লেবানন সীমান্ত থেকে একের পর এক সংঘাতের খবর আসতে থাকায় দুপুরের দিকে তা ঘুরে দাঁড়ায় এবং শেষ পর্যন্ত ০.৬৫ শতাংশ বৃদ্ধি পায়। মূলত হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতা স্মারকের প্রকৃত কার্যকারিতা নিয়ে বৈশ্বিক বিনিয়োগকারীদের চুলচেরা বিশ্লেষণ ও আশঙ্কার কারণেই বাজারে এই অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। আগস্ট মাসে সরবরাহের চুক্তি বা ‘ব্রেন্ট ফিউচার্স’-এর মূল্য ব্যারেলপ্রতি ৮০.৩৭ মার্কিন ডলারে গিয়ে ঠেকেছে, যা চলতি সপ্তাহের বুধবারের পর এই প্রথম ৮০ ডলারের মনস্তাত্ত্বিক সীমা অতিক্রম করল।

আল জাজিরার তথ্যমতে, দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলি বিমান হামলায় ১৬ জন লেবানিজ নাগরিক নিহতের পর হিজবুল্লাহর পাল্টা ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় এক ইসরায়েলি ব্যাটালিয়ন কমান্ডারসহ চার সেনা নিহত হন। এই রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে ইউরোপের কূটনৈতিক অঙ্গনে; স্থগিত করা হয়েছে জেনেভায় মার্কিন ও ইরানি কর্মকর্তাদের মধ্যকার পূর্বনির্ধারিত ওয়ার্কিং সেশন। এই ভূ-রাজনৈতিক ধাক্কায় এশিয়ার প্রধান দুটি শেয়ারবাজার—টোকিও ও সিউলে তীব্র ওঠানামা দেখা গেছে। দক্ষিণ কোরিয়ার ‘কোস্পি’ (KOSPI) সূচক লেনদেনের শুরুতে রেকর্ড ২.৫ শতাংশ বাড়লেও দিনশেষে মাত্র ০.৮ শতাংশ লাভ ধরে রাখতে সক্ষম হয়। অন্যদিকে জাপানের ‘নিক্কেই ২২৫’ (Nikkei 225) সূচক ০.৬ শতাংশ ইতিবাচক অবস্থান থেকে ছিটকে গিয়ে ০.০৮ শতাংশ লোকসানে দিন শেষ করেছে।

তবে ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যেও সমুদ্রপথে জ্বালানি পরিবহন ট্র্যাকিংকারী আন্তর্জাতিক সংস্থা ‘কেপলার’ (Kpler) একটি স্বস্তিদায়ক তথ্য দিয়েছে। দীর্ঘ কয়েক সপ্তাহ পারস্য উপসাগরে নিজেদের রাডার বা ‘ট্রান্সপন্ডার’ বন্ধ রাখার পর, বৃহস্পতিবার সৌদি আরবের তিনটি সুপার ট্যাঙ্কার হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করে বিশ্বম্যাপে নিজেদের অবস্থান পুনরায় সচল করেছে। এছাড়া হংকংয়ের পতাকাবাহী তেলের ট্যাঙ্কার ‘তং লিন ওয়ান’ এবং ফ্রান্সের এলএনজি পরিবাহী বড় জাহাজ ‘মরাইখ’ কোনো বাধা ছাড়াই প্রণালি পাড়ি দিয়েছে। শিপ ট্র্যাকিং ডেটা সতর্ক করে জানিয়েছে যে, চুক্তি অনুযায়ী হরমুজ প্রণালি জাহাজ চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করা হলেও বর্তমানে এর ট্রাফিক জট অত্যন্ত ধীর। সাধারণ সময়ে যেখানে দৈনিক ১২০ থেকে ১৩০টি জাহাজ এই পথ দিয়ে যাতায়াত করত, সেখানে বর্তমানে ৫০০-এরও বেশি তেল ও গ্যাস ট্যাঙ্কার পারস্য উপসাগরে দীর্ঘ লাইনে অপেক্ষমাণ রয়েছে।