― Advertisement ―

ভারতের সঙ্গে চুক্তির প্রতিবাদে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সামনে ছাত্র জোটের বিক্ষোভ

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফরে রেল কানেকটিভিটি বিষয়ে দুই দেশের মধ্যে সমঝোতা চুক্তির প্রতিবাদে পুলিশের বাধা অতিক্রম করে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সামনে বিক্ষোভ সমাবেশ করেছে...

বাণিজ্যচুক্তি নয়, এটি মার্কিন প্রশাসনের ‘হুকুমনামা’: জাতীয় প্রেসক্লাবে অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্পাদিত সাম্প্রতিক দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যচুক্তিকে একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের মুক্ত বাণিজ্যনীতির পরিপন্থী এবং মার্কিন প্রশাসনের একতরফা ‘হুকুমনামা’ বলে তীব্র সমালোচনা করেছেন তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-সবুজ বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির সাবেক সদস্য-সচিব অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ। আজ বুধবার সকালে জাতীয় প্রেসক্লাবে ‘সাম্রাজ্যবাদ ও যুদ্ধবিরোধী জোট’ আয়োজিত এক গোলটেবিল বৈঠকে তিনি এই মন্তব্য করেন। অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেন, বাজার অর্থনীতির স্বাভাবিক নিয়ম লঙ্ঘন করে এই চুক্তির মাধ্যমে বাংলাদেশকে জোরপূর্বক তুলনামূলক ব্যয়বহুল ও অপ্রয়োজনীয় মার্কিন পণ্য উচ্চমূল্যে আমদানি করতে বাধ্য করা হচ্ছে। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) কোনো স্বীকৃত বিধিবিধানের প্রতিফলন এই চুক্তিতে নেই উল্লেখ করে তিনি বলেন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন বা ভারতের মতো বড় অর্থনৈতিক শক্তিগুলো যেখানে এই চুক্তি সুকৌশলে এড়িয়ে গেছে, সেখানে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার জাতীয় নির্বাচনের মাত্র তিন দিন আগে তড়িঘড়ি করে কেন এই অসম চুক্তিতে স্বাক্ষর করল, তা নিয়ে গভীর রহস্য ও জনমনে প্রশ্ন রয়েছে।

একই গোলটেবিল বৈঠকে চুক্তির কারিগরি ও আইনি অসারতা নিয়ে বিস্ফোরক তথ্য উপাত্ত তুলে ধরেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান। তিনি প্রকাশ করেন যে, যে অতিরিক্ত মার্কিন শুল্ক আরোপের ভয় দেখিয়ে বাংলাদেশকে এই চুক্তিতে বাধ্য করা হয়েছিল, চুক্তি স্বাক্ষরের মাত্র ১১ দিন পর (২০ ফেব্রুয়ারি) মার্কিন আদালত স্বয়ংক্রিয়ভাবে সেই অতিরিক্ত শুল্ক সম্পূর্ণ বাতিল করে দেয়। ফলে বাংলাদেশ যদি আর মাত্র কয়েকটা দিন ধৈর্য ধরত, তবে এই আত্মঘাতী চুক্তির কোনো আইনি বা অর্থনৈতিক প্রয়োজনই অবশিষ্ট থাকত না। এই চুক্তিকে সম্পূর্ণ ‘একপক্ষীয় এবং অসম’ আখ্যা দিয়ে অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান সতর্ক করেন যে, চুক্তিটি পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়িত হলে মার্কিন আদালতে বাতিল হওয়া শুল্কের চেয়েও মারাত্মক শর্তের বেড়াজালে আটকা পড়বে বাংলাদেশ। এর ফলে দেশের দেশীয় ওষুধশিল্প, ডেইরি খাত, আইটি ও ই-কমার্স খাত এবং ভূগর্ভস্থ গ্যাস-সম্পদ সরাসরি মার্কিন কর্পোরেট নিয়ন্ত্রণের ঝুঁকিতে পড়বে।

তৈরি পোশাক খাতের (RMG) ওপর এই চুক্তির বিধ্বংসী প্রভাবের গাণিতিক বিশ্লেষণ করে সিপিডির এই শীর্ষ অর্থনীতিবিদ জানান, বর্তমানে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক মার্কিন বাজারে প্রবেশের ক্ষেত্রে ১৬ শতাংশ নিয়মিত শুল্কের মুখোমুখি হয়। তবে এই নতুন ‘হুকুমনামা’ কার্যকর হলে এর সাথে আরও ১৯ শতাংশ অতিরিক্ত শুল্ক এবং তথাকথিত ‘জোরজবরদস্তিমূলক শ্রম’ (Forced Labor) দণ্ডের অজুহাতে আরও ১০ শতাংশ পেনাল্টি শুল্ক যুক্ত হতে পারে। এর ফলে বাংলাদেশী পোশাকের ওপর মোট শুল্কের বোঝা একলাফে ৪৫ শতাংশে গিয়ে ঠেকবে, যা দেশের প্রধান রপ্তানি খাতকে বৈশ্বিক বাজারে সম্পূর্ণ অপ্রতিদ্বন্দ্বী ও ধ্বংস করে দেবে। সবচেয়ে বৈষম্যমূলক বিষয় হলো, যেসব প্রতিযোগী দেশ যুক্তরাষ্ট্রের সাথে এই চুক্তি করেনি, তাদের ওপর এই বাড়তি শুল্কের কোনোটিই প্রযোজ্য হবে না।

বাণিজ্যিক শর্তের চরম অসামঞ্জস্যের কথা উল্লেখ করে মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, চুক্তিতে মার্কিন পণ্যের জন্য বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে ‘শূন্য শুল্ক’ (Zero Tariff) সুবিধা দেওয়ার সময়সীমা ৫ থেকে ১০ বছরের মধ্যে সুনির্দিষ্টভাবে লিখে দেওয়া হয়েছে। অথচ এর বিনিময়ে বাংলাদেশ মার্কিন বাজারে কী সুবিধা পাবে, তার কোনো সুনির্দিষ্ট উল্লেখ নেই; সেখানে কেবল অস্পষ্টভাবে বলা হয়েছে ‘পরবর্তী সময়ে একটি ফর্মুলা বের করা হবে’। এছাড়া এই চুক্তি বাংলাদেশের সার্বভৌম বাণিজ্যনীতিকে সম্পূর্ণ পঙ্গু করে দিয়েছে। চুক্তির শর্তানুযায়ী, চীনসহ বিশ্বের অন্য যেকোনো দেশের সাথে বাংলাদেশ যদি নতুন কোনো মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (FTA) করতে চায়, তবে তার আগে ওয়াশিংটনের কাছ থেকে বাধ্যতামূলক ছাড়পত্র বা আলোচনা করতে হবে। এই একতরফা শর্তের কারণে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব ও ভূ-রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা চরম হুমকির মুখে পড়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।