― Advertisement ―

ভারতে ‘তেলাপোকা পার্টি’র আকস্মিক উত্থান: দিল্লির রাজপথে তরুণদের ঢল, অস্বস্তিতে মোদী সরকার

ভারতের সুপ্রিম কোর্টের এক উন্মুক্ত শুনানিতে দেশের বেকার তরুণদের প্রতি প্রধান বিচারপতির অবমাননাকর মন্তব্যকে কেন্দ্র করে দেশটিতে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি) বা ‘তেলাপোকা পার্টি’ নামের এক নজিরবিহীন ও ব্যঙ্গাত্মক রাজনৈতিক আন্দোলনের উত্থান ঘটেছে। আম আদমি পার্টির (এএপি) সাবেক সোশ্যাল মিডিয়া স্ট্র্যাটেজিস্ট ও দলিত অধিকারকর্মী অভিজিৎ দিপকের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা এই প্রতীকী আন্দোলন এখন আর শুধু ভার্চুয়াল জগতেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা ভারতের ক্ষমতাসীন নরেন্দ্র মোদী সরকারের দীর্ঘ ১২ বছরের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য এক নতুন মনস্তাত্ত্বিক ও কৌশলগত অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। নিট-ইউজি (NEET-UG) পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং শিক্ষা ব্যবস্থার সাম্প্রতিক দুর্নীতির প্রতিবাদে গত শনিবার (৬ জুন) দিল্লির ঐতিহাসিক যন্তর মন্তরে হাজার হাজার তরুণের অংশগ্রহণে দলটির প্রথম রাজপথের কর্মসূচি সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে, যা আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ‘দ্য টেলিগ্রাফ’ এবং ‘ব্লুমবার্গ’-এর বিশ্লেষণে মোদী সরকারের জন্য এক দীর্ঘমেয়াদি ও গভীর চ্যালেঞ্জ হিসেবে আখ্যায়িত হয়েছে।

এই আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটে গত মাসে, যখন ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত এক শুনানিতে বেকার তরুণদের ‘তেলাপোকা’ ও ‘পরজীবী’র সঙ্গে তুলনা করেন। এই মন্তব্যে ক্ষুব্ধ হয়ে অভিজিৎ দিপকে গত ১৬ মে ক্ষমতাসীন দল বিজেপির নামের সাথে ব্যঙ্গ করে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’র অনলাইন প্ল্যাটফর্ম চালু করেন, যা মাত্র পাঁচ দিনের মধ্যে লাখ লাখ অনুসারী অর্জনে সক্ষম হয়। প্রতিকূল পরিবেশেও তেলাপোকার টিকে থাকার অবিশ্বাস্য ক্ষমতাকে নিজেদের অবহেলিত ও বঞ্চিত জীবনের প্রতিচ্ছবি হিসেবে বেছে নিয়েছে দেশটির তরুণরা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টনের নিরাপদ জীবন ছেড়ে গত শনিবার সিজেপি প্রধান অভিজিৎ দিপকে দিল্লির ইন্দিরা গান্ধী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পা রাখলে হাজারো সমর্থক তাঁকে স্বাগত জানায় এবং কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে দিল্লির রাজপথে স্লোগান তোলে, “তেলাপোকারা আসছে, ধর্মেন্দ্র প্রধান যাচ্ছে।”

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হওয়া এই আন্দোলনকে দক্ষিণ এশিয়ার সাম্প্রতিক ‘জেন-জি’ (Gen-Z) বা তরুণ প্রজন্মের সামাজিক অভ্যুত্থানের জোয়ারের সাথে তুলনা করছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকেরা। বাংলাদেশ ও নেপালে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ভিত্তিক তরুণদের আন্দোলন যেভাবে সরকার পরিবর্তনের অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছিল, ভারতের সিজেপি-র দ্রুত বিস্তারকেও অনেকে সেই সমাজতাত্ত্বিক ফ্রেমেই দেখছেন; যদিও সিজেপি সম্পূর্ণ অহিংস ও নিয়মতান্ত্রিক চাপ সৃষ্টিকারী গ্রুপ হিসেবে কাজ করার নীতি গ্রহণ করেছে। এই আন্দোলন মূলত ভারতের শিক্ষা ব্যবস্থা ও কর্মসংস্থানের মধ্যকার গভীর ফাটলকে সামনে এনেছে, যেখানে বিশ্বব্যাংকের তথ্যমতে তরুণদের বেকারত্বের হার প্রায় ১৬ শতাংশ এবং আজিম প্রেমজি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে যে দেশের ২০ থেকে ২৯ বছর বয়সী বেকারদের ৬৭ শতাংশই উচ্চশিক্ষিত স্নাতক পাস।

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এখনো বিশ্বে ৬৮ শতাংশ জনসমর্থন নিয়ে অন্যতম জনপ্রিয় নেতা এবং তাঁর দল বিজেপি সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতা দখলসহ ভারতের দুই-তৃতীয়াংশ রাজ্যের শাসনভার নিজেদের হাতে রেখে রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে। তা সত্ত্বেও, ভারতের ৬৫ শতাংশ জনসংখ্যার বয়স যেখানে ৩৫ বছরের নিচে, সেখানে শীর্ষ নীতিনির্ধারকদের গড় বয়স ৬০ থেকে ৭০ বছর হওয়ায় তৈরি হওয়া ‘প্রজন্মগত ব্যবধান’ (Generational Gap) তরুণদের মধ্যে তীব্র প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষোভের জন্ম দিচ্ছে। তামিলনাড়ুর সাম্প্রতিক নির্বাচনে চলচ্চিত্র তারকা বিজয় থালাপতির আকস্মিক রাজনৈতিক বিজয়ের মতো ঘটনাগুলো প্রমাণ করে যে তরুণ ভোটাররা ঐতিহ্যবাহী দলগুলোর বাইরে বিকল্প খুঁজছেন। শুরুতে বিজেপি সিজেপি-কে ‘অনলাইন স্টান্ট’ বলে উড়িয়ে দিলেও, দিল্লির রাজপথে তরুণের ঢল প্রমাণ করেছে যে এই প্রতীকী প্রতিরোধ দীর্ঘমেয়াদে মোদী সরকারের জন্য গভীর রাজনৈতিক রূপান্তরের কারণ হতে পারে।