রাজধানীর মিরপুরের পল্লবীতে আট বছরের এক শিশু শিক্ষার্থীকে ধর্ষণের পর নৃশংসভাবে গলা কেটে হত্যার চাঞ্চল্যকর মামলায় প্রধান আসামি সোহেল রানা এবং তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আদালত। আজ রোববার (৭ জুন) ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীন জনাকীর্ণ আদালতে এই রায় ঘোষণা করেন। সর্বোচ্চ সাজার পাশাপাশি আদালত প্রধান আসামি সোহেলকে ৫ লাখ টাকা এবং তার স্ত্রী স্বপ্নাকে ২ লাখ টাকা অর্থদণ্ডে দণ্ডিত করেছেন। গত ১৯ মে সংঘটিত এই বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডের মাত্র ১৯ দিনের মাথায় এবং রেকর্ড ১৭ দিনের বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে এই চূড়ান্ত রায় ঘোষণা করা হলো।
রায় ঘোষণাকে কেন্দ্র করে আজ সকাল থেকেই আদালত পাড়ায় অতিরিক্ত তিন প্লাটুন পুলিশসহ শতাধিক নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন করে নজিরবিহীন নিরাপত্তা বলয় সৃষ্টি করা হয়। সকাল সাড়ে আটটার দিকে কড়া পুলিশি পাহারায় দুই আসামিকে আদালতে হাজির করা হয়। গত ৪ জুন রাষ্ট্র ও আসামিপক্ষের আইনজীবীদের তুমুল যুক্তিতর্ক শুনানি শেষে আদালত রায়ের জন্য আজকের দিনটি ধার্য করেছিলেন। রাষ্ট্রপক্ষের বিশেষ পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) অ্যাডভোকেট আজিজুর রহমান দুলু ফরেনসিক আলামত, ডিএনএ প্রোফাইলিং এবং আসামিদের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দির মাধ্যমে অপরাধের একটি অকাট্য ‘চেইন অব ফ্যাক্ট’ আদালতে প্রমাণ করতে সক্ষম হন, যার ভিত্তিতে ট্রাইব্যুনাল দুই আসামিরই সর্বোচ্চ শাস্তি মঞ্জুর করেন।
এই রায়ের একটি নজিরবিহীন দিক হলো, দেশের ইতিহাসে প্রথমবার মৃত্যুদণ্ডের মতো সর্বোচ্চ সাজার রায়ে রাষ্ট্রপক্ষ ও আসামিপক্ষ উভয়ই পূর্ণ সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছে। সাধারণত আসামিপক্ষ উচ্চতর আদালতে আপিলের ঘোষণা দিলেও, এই মামলায় রাষ্ট্র কর্তৃক নিযুক্ত আসামিপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মুসা কালিমুল্ল্যাহ রায়ের পর এক প্রতিক্রিয়ায় অকপটে স্বীকার করেন যে, অপরাধীরা তাদের উপযুক্ত বিচার পেয়েছে এবং এই রায়ে তিনি সম্পূর্ণ সন্তুষ্ট। অন্যদিকে রাষ্ট্রপক্ষ একে শিশু সুরক্ষায় ও অপরাধ দমনে একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক হিসেবে আখ্যায়িত করেছে, যা ভবিষ্যতে শিশুদের জন্য একটি নিরাপদ সমাজ গঠনে ভূমিকা রাখবে।
মামলার এজাহার থেকে জানা যায়, গত ১৯ মে সকালে প্রতিবেশী ভাড়াটিয়া সোহেল ও স্বপ্নার ফ্ল্যাটের ভেতর পাশবিক নির্যাতন ও হত্যার শিকার হয় শিশুটি। স্কুলে যাওয়ার সময় শিশুটির সন্ধান না পেয়ে তার মা-বাবা আসামির দরজার সামনে সন্তানের জুতো দেখতে পান। পরবর্তীতে প্রতিবেশীদের সহায়তায় দরজা ভেঙে শয়নকক্ষের মেঝেতে শিশুটির খণ্ডিত দেহ এবং একটি প্লাস্টিকের বালতির ভেতর তার মাথা উদ্ধার করা হয়। ঘটনার দিনই পুলিশ শৌচাগারের গ্রিল ভেঙে পালিয়ে যাওয়া প্রধান আসামি সোহেল রানাকে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থেকে এবং তার স্ত্রী স্বপ্নাকে ঘটনাস্থল থেকে গ্রেপ্তার করে। ২০ মে মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে নিজেদের অপরাধ স্বীকার করে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছিলেন এই ঘাতক দম্পতি।



