ভোলার চরফ্যাশন উপজেলার মুজিবনগর ইউনিয়নে জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধের জেরে ঘুমন্ত গৃহবধূ বকুল বেগমকে নৃশংসভাবে কুপিয়ে হত্যার ঘটনায় দায়েরকৃত মামলার ঐতিহাসিক রায় ঘোষণা করেছেন আদালত। দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া, প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষ্যগ্রহণ এবং ফরেনসিক তথ্যপ্রমাণ বিশ্লেষণ শেষে মামলার প্রধান ৩ আসামিকে মৃত্যুদণ্ড এবং আরও ৭ আসামিকে বিভিন্ন মেয়াদে সশ্রম কারাদণ্ডাদেশ দেওয়া হয়েছে। গতকাল রোববার (২৪ মে, ২০২৬) চরফ্যাশন চৌকি আদালতের অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ মো. শওকত হোসাইন জনাকীর্ণ আদালতে এই যুগান্তকারী রায় ঘোষণা করেন। রায় ঘোষণাকালে রাষ্ট্র ও আসামিপক্ষের আইনজীবীদের পাশাপাশি মামলার অন্যতম এক আসামি কাঠগড়ায় উপস্থিত ছিলেন।
আদালতের রায় অনুযায়ী, দণ্ডপ্রাপ্ত প্রধান তিন আসামি হলেন—আব্দুল মালেক পণ্ডিত, মোহাম্মদ ইব্রাহিম ও আব্দুল মান্নান। পেনাল কোডের (দণ্ডবিধি) ৩০২ ধারায় আনা সুনির্দিষ্ট হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় বিজ্ঞ বিচারক তাঁদের প্রত্যেককে সর্বোচ্চ সাজা ‘মৃত্যুদণ্ড’ এবং ২০ হাজার টাকা করে অর্থদণ্ডে দণ্ডিত করেন; জরিমানার অর্থ অনাদায়ে তাঁদের আরও ৬ মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে। একই মামলার সহ-আসামি মোহাম্মদ সেলিম ও মোহাম্মদ রফিককে অপরাধে সরাসরি সহযোগিতার দায়ে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড এবং ২০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। এই অর্থদণ্ড পরিশোধে ব্যর্থ হলে তাঁদেরও অতিরিক্ত ৬ মাস বিনাশ্রম কারাদণ্ড কাটতে হবে।
হত্যাকাণ্ডের পর মূল অপরাধীদের রাষ্ট্রীয় আইন থেকে পালাতে ও আশ্রয় দিতে সহায়তার অভিযোগে দণ্ডবিধির ২১২ ধারায় আসামি মোহাম্মদ জসিম, মোহাম্মদ ফিরোজ ও মোহাম্মদ সোহাগকে ৩ বছর করে সশ্রম কারাদণ্ড এবং ৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে; অনাদায়ে ১ মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড। এ ছাড়া তথ্য গোপনের অপরাধে দণ্ডবিধির ২০৩ ধারায় মোহাম্মদ আলম বাচ্চু মেলকারকে ২ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড এবং অগ্নিসংযোগ ও অপরাধের ষড়যন্ত্রের দায়ে দণ্ডবিধির ১১০ ও ৪৩৬ ধারায় মোহাম্মদ কবিরকে ৫ বছরের সশ্রম কারাদণ্ডসহ ১০ হাজার টাকা জরিমানা (অনাদায়ে ২ মাস বিনাশ্রম কারাদণ্ড) দেওয়া হয়েছে। তবে অপরাধের সাথে সম্পৃক্ততা প্রমাণিত না হওয়ায় আসামি আজাদকে মামলা থেকে বেকসুর খালাস দিয়ে তাঁর বিরুদ্ধে জারিকৃত ওয়ারেন্ট প্রত্যাহারের নির্দেশ দেন আদালত।
আদালতের এই রায়কে স্থানীয় সর্বস্তরের মানুষ ও ভুক্তভোগী পরিবার ন্যায়বিচারের এক অনন্য প্রতিফলন হিসেবে দেখছেন। মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, ২০২২ সালের ২৯ নভেম্বর গভীর রাতে তেঁতুলিয়া নদী উপকূলবর্তী মুজিবনগর ইউনিয়নের সিকদারের চরের ৯ নম্বর ওয়ার্ডে আলম বাচ্চু মেলকারের বসতঘরের বারান্দায় ঘুমিয়ে থাকা অবস্থায় বকুল বেগমকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। তাঁকে বাঁচাতে এসে গুরুতর জখম হন তাঁর বড় বোন মুকুল বেগম। ঘটনার ৩ দিন পর স্থানীয় অলিল চৌকিদার বাদী হয়ে দুলারহাট থানায় একটি অজ্ঞাতনামা হত্যা মামলা দায়ের করেন। দীর্ঘ তদন্ত শেষে পুলিশ ১১ জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট (অভিযোগপত্র) দাখিল করলে আদালত এই চুরান্ত রায় প্রদান করেন।



