― Advertisement ―

রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাঝে ৩২ ঘণ্টার শান্তি: অর্থডক্স ইস্টারে যুদ্ধবিরতির পথে রাশিয়া ও ইউক্রেন

এক টানা যুদ্ধের দামামা আর কামানের গোলার গর্জনে যখন আকাশ-বাতাস প্রকম্পিত, তখন ধর্মীয় বিশ্বাসের টানে সাময়িকভাবে শান্ত হতে চলেছে ইউক্রেনের রণক্ষেত্র। অর্থডক্স ইস্টার বা পবিত্র পুনরুত্থান পার্বণ উপলক্ষে রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে একটি সংক্ষিপ্ত ও অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি শুরু হতে যাচ্ছে। শনিবার (১১ এপ্রিল ২০২৬) বিকেল থেকে এই যুদ্ধবিরতি কার্যকর হবে বলে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়েছে। যদিও এই শান্তি কতক্ষণ স্থায়ী হবে বা উভয় পক্ষ একে কতটা সম্মান করবে, তা নিয়ে এখনো সংশয় রয়ে গেছে।

ক্রেমলিনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, রাশিয়ার বর্তমান প্রতিরক্ষামন্ত্রী আন্দ্রেই বেলৌসোভ এবং সেনাপ্রধান ভ্যালেরি গেরাসিমভকে কড়া নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যাতে নির্ধারিত সময়ে সব ধরনের সামরিক অভিযান বন্ধ রাখা হয়। বিশেষ করে ইউক্রেনের সম্মুখ সমরে থাকা রুশ সেনাদের এই ৩২ ঘণ্টা কোনো ধরনের উসকানিমূলক কর্মকাণ্ডে না জড়ানোর জন্য সতর্ক করা হয়েছে। রুশ প্রশাসনের এই সিদ্ধান্ত মূলত ধর্মীয় অনুভূতির প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন এবং দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে ক্লান্ত সেনাদের কিছুটা বিশ্রামের সুযোগ দেওয়া হিসেবে দেখা হচ্ছে।

ঘোষণা অনুযায়ী, শনিবার বিকেল ৪টা (গ্রিনউইচ মান সময় দুপুর ১টা) থেকে এই বিশেষ যুদ্ধবিরতি শুরু হবে। এটি রবিবার দিন শেষে অর্থাৎ মধ্যরাত পর্যন্ত কার্যকর থাকবে। মোট ৩২ ঘণ্টার এই সাময়িক বিরতিকে কেন্দ্র করে ইউক্রেনের সাধারণ মানুষের মনে কিছুটা আশার আলো দেখা দিয়েছে। যুদ্ধের ভয়াবহতায় যারা দীর্ঘদিন গির্জায় গিয়ে প্রার্থনা করতে পারেননি, তারা এই সুযোগে পবিত্র ইস্টারের আচার-অনুষ্ঠান পালনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তবে ইউক্রেনীয় বাহিনীর পক্ষ থেকে এই বিরতিকে রাশিয়ার ‘রণকৌশল’ হিসেবেও সন্দেহ করা হচ্ছে।

যুদ্ধবিরতি এমন এক সময়ে কার্যকর হচ্ছে যখন ইউক্রেন সংকট নিরসনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন পশ্চিমা বিশ্বের সব ধরনের কূটনৈতিক প্রচেষ্টা কার্যত ব্যর্থ প্রমাণিত হয়েছে। ওয়াশিংটন ও ব্রাসেলস থেকে বারবার আলোচনার টেবিলের বসার আহ্বান জানানো হলেও কোনো পক্ষই এখন পর্যন্ত স্থায়ী সমাধানের পথে হাঁটেনি। এই প্রেক্ষাপটে ধর্মীয় উৎসবকে কেন্দ্র করে এই সংক্ষিপ্ত বিরতি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে একটি নতুন বার্তা দিচ্ছে যে, এখনো মানবিক ও ধর্মীয় আবেদন যুদ্ধের চেয়ে বড় হয়ে উঠতে পারে।

বিশ্লেষকদের মতে, রাশিয়ার এই যুদ্ধবিরতির সিদ্ধান্ত কেবল ধর্মীয় নয়, বরং কিছুটা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিতও হতে পারে। এর মাধ্যমে তারা আন্তর্জাতিক মহলে নিজেদের ‘শান্তিকামী’ হিসেবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করছে। অন্যদিকে, ইউক্রেনের ভেতরে যারা রুশ অর্থডক্স গির্জার অনুসারী, তাদের সহানুভূতি অর্জন করাও মস্কোর অন্যতম লক্ষ্য হতে পারে। তবে কিয়েভ সরকার এখনো এই যুদ্ধবিরতি নিয়ে তাদের পূর্ণাঙ্গ প্রতিক্রিয়া জানায়নি, যদিও স্থানীয় স্তরে অনেক জায়গায় গোলাগুলি কমার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।

এই ৩২ ঘণ্টার শান্তিতে সবচেয়ে বেশি স্বস্তি পেয়েছে যুদ্ধবিধ্বস্ত সীমান্ত অঞ্চলের সাধারণ নাগরিকরা। যারা কয়েক মাস ধরে বাঙ্কারে আশ্রয় নিয়েছিলেন, তারা হয়তো এই সুযোগে একটু খোলা বাতাসে নিশ্বাস নেওয়ার এবং প্রয়োজনীয় খাদ্য ও ওষুধ সংগ্রহের সুযোগ পাবেন। রেড ক্রস এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো এই সময়ে মানবিক সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার পরিকল্পনা করছে। তবে সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে যাতায়াত এখনো অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে।

দীর্ঘমেয়াদী সংঘাত নিরসনে এই ধরনের অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে সংশয়বাদী বিশ্লেষকদের সংখ্যাই বেশি। এর আগেও বিভিন্ন সময়ে ধর্মীয় উৎসব বা মানবিক করিডোর তৈরির জন্য বিরতি দেওয়া হলেও তা স্থায়ী হয়নি। বরং অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে, এই বিরতির সুযোগে উভয় পক্ষই পুনরায় শক্তি সঞ্চয় করে আরও ভয়াবহভাবে আক্রমণ শুরু করে। ফলে ৩২ ঘণ্টা পর পরিস্থিতি আবার আগের মতো উত্তপ্ত হয়ে ওঠার শঙ্কা প্রবল।

ক্রেমলিনের এই নির্দেশনায় স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, ৩২ ঘণ্টা পর অর্থাৎ রবিবারের পর থেকে পুনরায় সামরিক অভিযান আগের গতিতে শুরু হবে। এর মানে দাঁড়ায়, এই শান্তি কেবল এক পশলা বৃষ্টির মতো যা যুদ্ধের দাবদাহকে সাময়িকভাবে ঠান্ডা করবে কিন্তু নেভাতে পারবে না। যুদ্ধবিরতির সময়সূচি গ্রিনউইচ সময়ের সাথে সমন্বয় করার ফলে এটি বিশ্বজুড়ে মিডিয়ার নজরে রয়েছে, যা রাশিয়ার ওপর এক ধরনের নৈতিক চাপও সৃষ্টি করেছে।

পরিশেষে, অর্থডক্স ইস্টার উপলক্ষে এই যুদ্ধবিরতি হয়তো ইউক্রেনের মানুষের জন্য এক চিলতে হাসি নিয়ে আসবে। কিন্তু এই হাসির আড়ালে যে দীর্ঘস্থায়ী কান্নার রেশ রয়েছে, তা নিরসনে প্রয়োজন একটি স্থায়ী এবং সম্মানজনক শান্তি চুক্তি। ৩২ ঘণ্টার এই ‘পবিত্র বিরতি’ কেবল ইতিহাসের পাতায় একটি সংক্ষিপ্ত টীকা হয়ে থাকবে, নাকি এটি বড় কোনো আলোচনার দুয়ার খুলবে, তা সময়ই বলে দেবে। আপাতত বিশ্ববাসী রবিবার মধ্যরাত পর্যন্ত কামানের স্তব্ধতার দিকে তাকিয়ে আছে।