দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতি ও কৌশলগত অংশীদারিত্বের এক ঐতিহাসিক মাইলফলক হিসেবে চীন ও পাকিস্তানের কূটনৈতিক সম্পর্কের ৭৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে বিশেষ স্মারক মুদ্রা প্রকাশের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়েছে পাকিস্তান সরকার। দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক ‘স্টেট ব্যাংক অব পাকিস্তান’ (SBP) এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, দুই দেশের দীর্ঘদিনের অটুট বন্ধুত্বকে সম্মান জানাতে সম্পূর্ণ নতুন নকশার একটি বিশেষ ৭৫ রুপির স্মারক মুদ্রা তৈরি করা হয়েছে। আগামী ২৫ মে (২০২৬) থেকে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সবকটি আঞ্চলিক কার্যালয় ও বাণিজ্যিক কাউন্টারের মাধ্যমে এই বিশেষ মুদ্রাটি সাধারণ মানুষের সংগ্রহের জন্য উন্মুক্ত ও বাজারে সরবরাহ করা হবে।
ইতিহাসের খতিয়ান অনুযায়ী, পাকিস্তান ও চীন আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের দ্বিপাক্ষিক কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করেছিল ১৯৫১ সালের ২১ মে। ১৯৪৯ সালে মাও সেতুংয়ের নেতৃত্বে গণপ্রজাতন্ত্রী চীন (PRC) প্রতিষ্ঠার মাত্র দুই বছরেরও কম সময়ের মধ্যে দূরদর্শী ইসলামাবাদ বেইজিংয়ের কমিউনিস্ট সরকারের সাথে প্রাতিষ্ঠানিক সম্পর্ক গড়ে তোলে। শুধু তাই নয়, তৎকালীন বৈশ্বিক রাজনৈতিক সমীকরণকে বদলে দিয়ে বিশ্বের প্রথম মুসলিম রাষ্ট্র হিসেবে চীনের সাথে পূর্ণাঙ্গ কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনকারী দেশের গৌরবময় কৃতিত্বও অর্জন করেছিল পাকিস্তান। গত সাড়ে সাত দশক ধরে আন্তর্জাতিক নানা চড়াই-উতরাইয়ের মাঝেও দুই দেশের এই সম্পর্ক আরও মজবুত হয়েছে।
পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে এই স্মারক মুদ্রার সুনির্দিষ্ট গাঠনিক ও ধাতব উপাদান প্রকাশ করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড বজায় রেখে তৈরি করা এই বিশেষ মুদ্রাটিতে ৭৫ শতাংশ তামা (Copper) এবং ২৫ শতাংশ নিকেল (Nickel) ব্যবহার করা হয়েছে। গোলাকার এই মুদ্রার ব্যাস রাখা হয়েছে ৩৬ মিলিমিটার এবং এর সামগ্রিক ওজন নির্ধারণ করা হয়েছে ঠিক ১৯ গ্রাম। মুদ্রার শৈল্পিক নকশায় দুই দেশের জাতীয় সংস্কৃতির মেলবন্ধন ঘটানো হয়েছে; যার এক পাশে খোদাই করা হয়েছে পাকিস্তানের ঐতিহ্যবাহী চাঁদ-তারার রাষ্ট্রীয় প্রতীক এবং অন্য পাশে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে পাকিস্তান ও চীনের জাতীয় পতাকাকে পাশাপাশি স্থাপন করা হয়েছে। এছাড়া মুদ্রার কিনারায় উর্দু, ইংরেজি ও চীনা— এই তিনটি আন্তর্জাতিক ভাষায় দুই দেশের সম্পর্কের মূল ভিত্তি “বিশ্বাস, বন্ধুত্ব ও সমর্থন” শব্দগুলো খোদাই করা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, পাকিস্তানের এই নতুন স্মারক মুদ্রাটি কেবল একটি প্রতীকী মুদ্রা নয়; বরং এটি বেইজিং ও ইসলামাবাদের মধ্যকার গভীর কৌশলগত অংশীদারিত্ব এবং চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর বা ‘সিপেক’ (CPEC) এর মতো ট্রিলিয়ন ডলারের মেগা প্রকল্পের অর্থনৈতিক সহযোগিতার একটি দৃশ্যমান স্মারক। বর্তমান বিশ্ব রাজনীতিতে যখন নানা মেরুকরণ চলছে, ঠিক তখন চীনের সাথে সম্পর্কের ৭৫ বছর পূর্তিতে পাকিস্তানের এই উদযাপন প্রমাণ করে যে, বেইজিংয়ের অন্যতম বিশ্বস্ত ও কৌশলগত মিত্র হিসেবে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখতে ইসলামাবাদ কতটা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।



