― Advertisement ―

বিনিয়োগে ডিজিটাল বিপ্লব: বিডার ওএসএস প্ল্যাটফর্মে যুক্ত হলো আরও ৫ ব্যাংক

বাংলাদেশে বিনিয়োগের পথ আরও মসৃণ ও ডিজিটাল করতে বড় পদক্ষেপ নিল বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা)। দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের ব্যাংকিং সেবা এক ছাদের নিচে পৌঁছে...

মেট্রোরেল এমআরটি লাইন-১ এর ব্যয়: গণমাধ্যমের বিভ্রান্তিকর তুলনার প্রতিবাদ

সারসংক্ষেপ

এই প্রতিবেদনটি সাম্প্রতিক কিছু গণমাধ্যমে প্রকাশিত সেই দাবির জবাব প্রদান করে, যেখানে বলা হয়েছে যে, ঢাকা মাস র‍্যাপিড ট্রানজিট ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট লাইন-১ (এমআরটি লাইন-১) প্রকল্পের ব্যয় ভারত ও অন্যান্য দেশের মেট্রো প্রকল্পের তুলনায় অতিরিক্ত বেশি। এই প্রতিবেদনটি প্রকল্প ব্যয়ের প্রকৃত প্রযুক্তিগত, নগর ও আর্থিক প্রেক্ষাপট ব্যাখ্যা করে এবং প্রমাণ করে যে ঘনবসতিপূর্ণ নগর এলাকায় নির্মিত পাতাল মেট্রো প্রকল্পগুলোর আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে ঢাকা এমআরটি লাইন-১ এর ব্যয় সামঞ্জস্যপূর্ণ। প্রতি কিলোমিটার ব্যয় তুলনার মাধ্যমে প্রকল্প ব্যয় নির্ধারণ করা বিভ্রান্তিকর, কারণ এতে পাতাল অংশের অনুপাত, প্রকৌশলগত জটিলতা, ও ভূতাত্ত্বিক চ্যালেঞ্জগুলো উপেক্ষা করা হয়। বর্তমান ব্যয় আন্তর্জাতিক নির্মাণ ব্যয় স্তরের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, এবং প্রকল্পটি পরিকল্পনা অনুযায়ী চলা উচিত।

১. ভিন্ন প্রকল্পের ভুল ব্যয় তুলনা

ঢাকা এমআরটি লাইন-১—যার একটি বড় অংশ পাতাল —এর সঙ্গে ভারতের বা উপসাগরীয় দেশের মূলত উড়াল বা স্থলভিত্তিক মেট্রোর ভুলভাবে তুলনা করেছে প্রতিবেদনটি। বিশ্বব্যাপী পাতাল মেট্রো লাইনের ব্যয় উড়াল লাইনের তুলনায় তিন থেকে পাঁচ গুণ বেশি। উদাহরণস্বরূপ, দিল্লি মেট্রোর ফেজ-৩ এর পাতাল অংশের ব্যয় ছিল প্রতি কিলোমিটারে ১৮০–২২০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা ঢাকার সঙ্গে তুলনীয়। তাই “পাঁচ গুণ বেশি” এমন দাবি প্রকৌশলগতভাবে ভুল ও বিভ্রান্তিকর।

২. অত্যন্ত জটিল নগর ও ভূতাত্ত্বিক অবস্থা

ঢাকা বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ মহানগরী (≈ ৪৭,০০০ জন/বর্গকিমি)। এমন পরিবেশে নির্মাণ কাজ পরিচালনা করতে জটিল যানবাহন ডাইভার্শন, ইউটিলিটি স্থানান্তর, ভূমি পুনর্বাসন ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা প্রয়োজন। শহরটির নরম পলিমাটি এবং High Water Table টানেল নির্মাণকে ব্যয়বহুল ও প্রযুক্তিগতভাবে কঠিন করে তোলে। ফলে ধারাবাহিক মাটির উন্নয়ন ও জলরোধী ব্যবস্থা প্রয়োজন, যা পাটনা বা পুনের মতো শহরে তেমনভাবে প্রযোজ্য নয়।

৩. উন্নত নকশা ও সিস্টেম ইন্টিগ্রেশন

ঢাকা এমআরটি লাইন-১ (৩১ কিমি, 19 টি স্টেশন) এর মধ্যে ১৬.৩২ কিমি পাতাল (এয়ারপোর্ট–কমলাপুর) এবং ১১.৪ কিমি উড়াল (নতুন বাজার–পুর্বাচল) অংশ অন্তর্ভুক্ত। এতে গভীর ইন্টারচেঞ্জ স্টেশন, সরাসরি বিমানবন্দর সংযোগ, সম্পূর্ণ শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ এবং উন্নত CBTC সিগন্যালিং ব্যবস্থা রয়েছে, যা আঞ্চলিক মেট্রোগুলোর তুলনায় অধিক আধুনিক। নতুন বাজার স্টেশনটি 672.40 মিটারের  দীর্ঘ, যা পাতাল ও উড়াল লাইনের সংযোগ বিন্দু। এ ধরনের স্টেশনের নির্মাণ ব্যয় সাধারণ পাতাল স্টেশনের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।

৪. আর্থিক ও ক্রয় প্রক্রিয়াগত প্রেক্ষাপট

ভারতের মেট্রো প্রকল্পগুলো প্রায়শই রাজ্য সরকার-সহায়িত ভূমি, দেশীয় ঠিকাদার ও কর-ছাড় সুবিধা পায়। অন্যদিকে, বাংলাদেশে জাইকা (JICA)-অর্থায়িত প্রকল্পগুলো আন্তর্জাতিক FIDIC মান, জাপানি শিল্পমান (JIS), এবং কঠোর নিরাপত্তা ও পরিবেশগত মানদণ্ড অনুসরণ করে। ফলে প্রাথমিক মূলধন ব্যয় বেশি হলেও প্রকল্পের স্থায়িত্ব ও নির্ভরযোগ্যতা নিশ্চিত হয়। ভারতে অধিকাংশ যন্ত্রপাতি ও পণ্য স্থানীয়ভাবে সংগ্রহ করা হয়, যেখানে ঢাকার এমআরটি প্রকল্পগুলোতে আন্তর্জাতিক মান পূরণকারী দেশ থেকে এসব উপকরণ আমদানি করা হয়। তাই এই ব্যয়ের তুলনা করলেই বাস্তব চিত্র প্রতিফলিত হয় না।

৫. জাইকা টেন্ডারিং প্রতিযোগিতা মূলক, একচেটিয়া নয়

এটা ভুল ধারণা যে জাইকা-অর্থায়িত প্রকল্পে শুধুমাত্র জাপানি ঠিকাদার অংশ নিতে পারে। জাইকা আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র (ICB) বাধ্যতামূলক করে, যা বিশ্বব্যাপী যোগ্য প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য উন্মুক্ত। ঢাকা এমআরটি প্রকল্পের প্রি-কোয়ালিফিকেশন (PQ) পর্যায়ে চীন, ভারত, থাইল্যান্ড, মিশর ,ইতালি, তুরস্ক, কোরিয়া ও জাপানের বহু প্রতিষ্ঠান অংশ নেয়। কঠোর প্রযুক্তিগত, নিরাপত্তা ও অভিজ্ঞতা মানদণ্ডের কারণে ভূগর্ভস্থ অংশে কেবল অল্পসংখ্যক প্রতিষ্ঠান যোগ্যতা অর্জন করে—যাদের মধ্যে জাপানি কোম্পানিগুলো শীর্ষে ছিল। তবে উঁচু অংশে PQ ধাপে বিভিন্ন দেশের ঠিকাদার যোগ্যতা অর্জন করেছে। তাই “শুধু জাপানি প্রতিষ্ঠানই অংশ নিতে পারে” এই দাবি সম্পূর্ণ মিথ্যা। জাইকা স্থানীয় সক্ষমতা গঠনে যৌথ উদ্যোগ, প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তি স্থানান্তরের মাধ্যমে সক্রিয়ভাবে কাজ করছে।

৬. দীর্ঘ মেয়াদি মূল্য ও অর্থনৈতিক প্রভাব

এমআরটি লাইন-১ এর নকশা আয়ু ১০০ বছর, যা নিরাপদ, নিম্ন-কার্বন নিঃসরণ পরিবহন সুবিধা প্রদান করবে। প্রকল্পটি যানজট, বায়ুদূষণ ও যাতায়াত সময় কমিয়ে দেশের সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে দীর্ঘমেয়াদি অবদান রাখবে।

৭. বৈশ্বিক অর্থনৈতিক কারণে ব্যয়বৃদ্ধি

এটি কোনো স্থানীয় অদক্ষতা নয়—বরং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক বাস্তবতার প্রতিফলন। বিশ্বব্যাপী মহামারী-পরবর্তী মুদ্রাস্ফীতি, সরবরাহ শৃঙ্খল বিঘ্ন, ও মুদ্রার অবমূল্যায়নের কারণে অবকাঠামো ব্যয় ৩০–৬০% পর্যন্ত বেড়েছে (বিশ্বব্যাংক, ২০২৩; আইএমএফ, ২০২৪)। স্টিল, সিমেন্ট, তামা ও অন্যান্য উপকরণের দাম বেড়ে গেছে, এবং আন্তর্জাতিক পরিবহন খরচ ২০২১–২২ সালে ৩০০% পর্যন্ত বৃদ্ধি পায় (UNCTAD, ২০২২; Bloomberg Index, ২০২৩)। বাংলাদেশি টাকার মান ২০১৯ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে প্রায় ২৮% অবমূল্যায়িত হয়েছে (বাংলাদেশ ব্যাংক, ২০২৪) যা বর্তমানে 43,4%। একই সময়ে জাপানি ইয়েন ও ইউরোর অস্থিরতা আমদানিকৃত সরঞ্জামের খরচ ও অর্থায়ন ব্যয়কে প্রভাবিত করেছে। রাশিয়া–ইউক্রেন সংঘাত-ইউএস-ইসরাইল-ইরান যুদ্ধের পরবর্তী জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধিও নির্মাণ উপকরণের খরচ বাড়িয়ে দেয় (IEA, ২০২৩)। ২০১৯ সালের পর বন্যা প্রতিরোধ, ভূমিকম্প সহনশীলতা, বায়ু চলাচল ও অগ্নি নিরাপত্তা উন্নয়নের মতো নকশা ও নিরাপত্তা উন্নতি যুক্ত হওয়ায় ব্যয় আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। এসব আপডেট FIDIC 2017 ও JIS মানদণ্ড অনুযায়ী করা হয়েছে। বিশ্বব্যাপী অনুরূপ প্রকল্পেও একই প্রবণতা দেখা গেছে: জাকার্তা এমআরটি ফেজ ২ (+২৩%), ব্যাংকক অরেঞ্জ লাইন (+১৮%), মুম্বাই মেট্রো লাইন ৩ (+২৫%), এবং লন্ডন ক্রসরেইল (+২৯%)। তাই ঢাকার ব্যয়বৃদ্ধি বিশ্বব্যাপী ধারা অনুযায়ীই হয়েছে।

৮. ঢাকা মেট্রোরেল প্রকল্প বাস্তবায়নে জনসেবার প্রয়োজনই অগ্রাধিকার পাওয়া উচিত:

ঢাকা ম্যাস র‌্যাপিড ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড (DMCTL)-এর একটি গুরুত্বপূর্ণ ম্যান্ডেট হচ্ছে ঢাকার মেট্রোরেল প্রকল্পগুলি সঠিকভাবে, নিরাপদে এবং সময়মতো বাস্তবায়ন করা। এর উদ্দেশ্য, শহরের তীব্র যানজট লাঘব করে গুরুত্বপূর্ণ জনসেবা নিশ্চিত করা। তবে ডিএমটিসিএল এর কিছু পদক্ষেপ ইঙ্গিত করে যে, রিভিউ কমিটির অজুহাতে প্রয়োজনীয় চুক্তিসম্পাদন বিলম্বিত করা হচ্ছে। এই পদক্ষেপ প্রকল্পের খরচ বাড়িয়ে তুলতে পারে এবং এতে জনদুর্ভোগ বৃদ্ধি পাওয়ার আশংকা রয়েছে।

বাংলাদেশ পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অথরিটি (বিপিপিএ) নং- ২১.০০.০০০০. ৩৯৭.২২. ০৫২.২৫-৬৯২ তারিখ ২৮ শ্রাবন ১৪৩২/ ১৩ আগষ্ট ২০২৫ এর মর্মার্থ (ডিএমটিসিএল এর আওতায় বাস্তবায়নাধীন এমআরটি লাইন-১ বিভিন্ন Contract Package-এর ক্রয় প্রস্তাব অনুমোদনের জন্য পরিচালনা পরিষদে উপস্থাপনের পূর্বে ব্যবস্খাপনা পরিচালক, ডিএমটিসিএল কর্তৃক Peer Review Team গঠন বিষয়ে বিপিপিএ-এর মতামত ও পাবলিক প্রকিউরমেন্ট আইন, ২০০৬ (পিপিএ, ২০০৬) -এর ধারা-৭ মোতাবেক কোন নির্দিষ্ট ক্রয়ের জন্য দরপত্র বা প্রস্তাবসমূহ একটির অধিক মূল্যায়ন কমিটি দ্বারা মূল্যায়ন করা যাবে না । তবে, পারলিক প্রকিউরমেন্ট বিধিমালা, ২০০৮ (পিপিআর, ২০০৮)-এর বিধি ১১(২) (খ) মোতাবেক [পরিবর্তিত পিপিআর, ২০২৫ এর বিধি ৪৭(২)(খ) মোতাবেক] মূল্যায়ন কমিটির সুপারিশ সামগ্রিকভাবে বিবেচনা করে অনুমোদনকারী কর্তৃপক্ষ উক্ত সুপারিশ সম্পর্কিত কোন সুনির্দিষ্ট বিষয়ে ক্রয়কারীর মাধ্যমে মূল্যায়ন কমিটির নিকট হতে ব্যাখ্যা আহ্বান করতে পারেন। ডিএমটিসিএল সকল আইন-কানুন, বিধি-বিধান ও জাইকা গাইড লাইনস, জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সি (JICA)-এর সকল নীতিমালা এবং FIDIC বিধানাবলী উপেক্ষা করে কমিটি গঠন করার ক্ষেত্রে পরামর্শদাতার ভূমিকায় অবতীর্ণ রয়েছে।

সম্প্রতি লাইন ১ এবং লাইন ৫ নর্থ-এর ডিএমটিসিএল ও পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সদস্যদের সরিয়ে দিয়ে এবং বেশিরভাগ টেন্ডারের বিড ভ্যালিডিটি সময়সীমা    পর্যালোচনা করার জন্য অতিক্রান্ত হওয়ার পথে । ২০১৮–১৯ সালে তৈরি করা প্রাথমিক সম্ভাব্যতা প্রতিবেদনের (Feasibility Study) এর ওপরে ভিত্তি করে প্রস্তুতকৃত DPP খরচের সাথে বা ভারতীয় প্রকল্পগুলির সাথে প্রকল্পের বর্তমান খরচের তুলনা করা উচিত হবে না । এই তুলনাগুলি বিভ্রান্তিকর, কারণ এগুলো ঢাকার মেট্রোরেলের জটিল কাজের পরিবেশ, ভূতাত্ত্বিক চ্যালেঞ্জ, অন্তর্নিহিত ঝুঁকি এবং অত্যন্ত ঘনবসতিপূর্ণ শহুরে পরিবেশকে উপেক্ষা করে। তাছাড়া Feasibility Study থেকে চুড়ান্ত নকশায় (Detail Design) এ প্রকল্পের বেশ কিছু গুরুত্বপুর্ণ পরিবর্তন, পরিবর্ধন ও সংশোধন হয়েছে যা ২০১৯ সালে অনুমোদিত ডিপিপিতে অন্তর্ভূক্ত ছিল না।

জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (JICA) এবং জাপানি দূতাবাস বারবার DMCTL-কে লাইন ১ প্রকল্পের CP02 এবং CP05 প্যাকেজের চুক্তি কার্যকর করার জন্য অনুরোধ জানিয়েছে, যার জন্য ক্রয় প্রক্রিয়ার বিভিন্ন ধাপ ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। কাজেই “খরচ কমানোর” অজুহাতে কোন কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ না করে কেবল সময় ক্ষেপণ করে এই প্যাকেজগুলিকে পিছিয়ে দেওয়া সঠিক প্রকল্প ব্যবস্থাপনার পরিপন্থী এবং তা জনসাধারণের আস্থা ও প্রকল্পের সময়মতো বাস্তবায়নকে হুমকির মুখে ফেলছে।

ঢাকা মেট্রোরেল শুধুমাত্র একটি অবকাঠামোগত প্রকল্প নয়; এটি কোটি নাগরিকের জন্য একটি লাইফলাইন, যারা প্রতিদিন দীর্ঘ যানজটের অজস্র কর্মঘন্টা হারান যা দেশের উৎপাদনশীলতাকে দারুণভাবে ব্যাহত করে। বিলম্ব মানেই উচ্চতর খরচ, নগর উন্নয়নের সুযোগ হাতছাড়া করা যা জনাকীর্ণ নগরীর যানজটপূর্ণ সড়কের উপর ক্রমবর্ধমান অতিরিক্ত চাপ। খরচ হ্রাসের পদক্ষেপ অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু সেগুলি সঠিকতা এবং ন্যায্যতার সাথে প্রয়োগ করতে হবে। সম্পূর্ণ ভিন্ন পরিসর ও শর্তযুক্ত প্রকল্পগুলির সাথে ভুল তুলনা করে এই পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করা উচিত নয়। DMCTL-কে এমন একজন যোগ্য, দক্ষ, চৌকস ও বাস্তববাদী ব্যক্তিত্বের নেতৃত্ব প্রয়োজন, যিনি মূল অবকাঠামো প্রকল্পগুলি সময়মতো সরবরাহ করতে সক্ষম।  অতীতের ব্যবস্থাপনা সময় ক্ষেপন করার ভুল অগ্রাধিকারের মধ্যে আটকে ছিলেন বা আছেন, যা জনসেবার বৃহত্তর উপকারিতা উপেক্ষা করে।

৯. ঢাকা এমআরটি লাইন-১ এশিয়ার অন্যতম চ্যালেঞ্জপূর্ণ নগর ও ভূতাত্ত্বিক পরিবেশে নির্মিত একটি প্রযুক্তিগতভাবে উন্নত ও নিরাপত্তা-সমৃদ্ধ প্রকল্প। এর ব্যয় কাঠামো আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। PQ ধাপে বিভিন্ন দেশের ঠিকাদার অংশগ্রহণ করেছে, যা এর উন্মুক্ত ও প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র প্রক্রিয়া নির্দেশ করে। বর্তমান অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে প্রকল্পটির ব্যয় যৌক্তিক ও ন্যায্য। তাই এটি পরিকল্পনা অনুযায়ী এগিয়ে নেওয়া অত্যাবশ্যক, যাতে বাংলাদেশের জনগণের জন্য টেকসই, আধুনিক ও নিরাপদ গণপরিবহন ব্যবস্থা নিশ্চিত হয়।

১০. অতি ঘনবসতিপূর্ণ এবং নিত্যদিনের অত্যধিক যানজট কবলিত ঢাকা শহরে উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তোলার স্বার্থে পাতাল রেল নির্মাণ পরিকল্পনা প্রণয়ন সরকারের একটি সময়োপযোগী উপযুক্ত সিদ্ধান্ত। ২০১৫ সালে প্রণীত আরএসটিপি (রিভাইজড স্ট্রাটেজিক ট্রান্সপোর্ট প্ল্যান) অনুসরণ করে এমআরটি লাইন-১ এর রুট এলাইনমেন্ট নির্ধারন করে ২০১৭-১৮ সালে প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই সম্পন্ন হয়। জাইকা কর্তৃক প্রণীত ঐ সম্ভাব্যতা সমীক্ষায় আন্তর্জাতিক মান ও রীতিনীতি, দেশের আর্থ-সামাজিক অবস্থা এবং ঢাকায় অবকাঠামো নির্মাণ উপযোগিতার বিষয়গুলো বিবেচনা করে এমআরটি লাইন-১ এর উড়াল এবং পাতাল পথ চূড়ান্ত করা হয়। ১৯.৮৭২ কিমি দীর্ঘ পাতাল এবং ১১.৩৬৯ কিমি দীর্ঘ উড়াল মেট্রোরেল সহ মোট ৩১.২৪১ কিমি দৈর্ঘ্যের এলাইনমেন্টের মধ্যে ১২ টি পাতাল ও ০৭ টি উড়াল স্টেশনের সংস্থান রয়েছে।

ঠিকাদারের উদ্ধৃত দরঃ

প্রকল্পের সর্বমোট ১২টি প্যাকেজের মধ্যে ইতোমধ্যে ০৯ টির দরপত্র দাখিল হয়েছে, যার মধ্যে একটি প্যাকেজের নির্মাণকাজ প্রায় সমাপ্ত এবং অপর ০৭ টি প্যাকেজের আর্থিক দরপত্র উন্মুক্ত করা হয়েছে এবং ০১ টি প্যাকেজের (সিপি-০৮) কারিগরি মূল্যায়ন চলমান রয়েছে। সামগ্রিকভাবে দরদাতাগনের উদ্ধৃত দর ডিপিপি মূল্যের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। প্রাক্কলিত ব্যয় (পিএ অংশ) ৩৯,৪৫০.৩২ কোটি টাকা হতে বৃদ্ধি পেয়ে বাস্তবায়নাধীন একটি প্যাকেজের চুক্তি মূল্য, ০৭ টি প্যাকেজের উদ্ধৃত দর ও ৪ টি প্যাকেজের Engineer’s Estimate বিবেচনায় ৭৫,৬৪৯ কোটি টাকা পর্যন্ত হতে পারে। প্রতি কিলোমিটার টানেল নির্মাণ ব্যয় ১২৫০.৭২ কোটি টাকা হতে বৃদ্ধি পেয়ে ২৩৯৮.৩৬ কোটি টাকা হতে পারে।

১১. প্রকল্পে বিশেষায়িত প্রযুক্তির ব্যবহারঃ

• শিল্ড টানেল সেগমেন্ট থেকে পানি লিকেজ (চুঁইয়ে পড়া) এড়াতে সেগমেন্টাল লাইনিং (আস্তরণ) থেকে পানি লিকেজজনিত দুর্ঘটনা এড়াতে টানেল সেগমেন্ট স্থাপনের সময়ে বিশেষ করে দুটো সেগমেন্টের জোড়া/সংযোগস্থলে (Joint) সেগমেন্টাল লাইনিং এর গুণগত মান সুনিশ্চিত করতে এবং শিল্ড টানেল সেগমেন্টের পৃষ্ঠতলে (Surface) কোনরকম কোন চিড়/ফাটল দৃশ্যমান না হওয়ার জন্য পানি নিরোধক জাপানি বিশেষ প্রযুক্তি ‘ওয়ান পাস জয়েন্ট’ ব্যবহার করা হবে।

• বালু নদীর উপর বিদ্যমান তিন স্প্যান বিশিষ্ট সেতুটি 149 মিটার দীর্ঘ এবং সেতু সংলগ্ন একটি আন্ডারপাস রয়েছে। বিদ্যমান সেতুটি অক্ষুন্ন রেখে তার উপর দিয়ে যথাযথ নির্মাণের সুবিধার্থে 172 মিটার দীর্ঘ একক স্প্যান বিশিষ্ট সেতুর প্রস্তাব করা হয়েছে।প্রকল্পের কন্ট্রাক্ট প্যাকেজ সিপি-০৮ এর দরপত্র দলিলে 172 মিটার দীর্ঘ একক স্প্যান বিশিষ্ট সেতুর জন্য SBHS (Steel for Bridge High-performance Structure) এর প্রস্তাব আছে।

১২.এখন প্রশ্ন প্রকল্পের ব্যয় কেন বৃদ্ধি পাচ্ছে ও ব্যয়ের ক্ষেত্রে মূল বিচ্যুতি কোন জায়গায়?

লাইন-১ এবং লাইন-৫ নর্থের DPP প্রণীত হয়েছিল ২০১৯ সালে যা ২০১৮ সালে শেষ হওয়া প্রাক সমীক্ষার (Prefeasibility Study) এর উপাত্তকে ভিত্তি ধরে। এই প্রাক-সমীক্ষা করা হয়েছিলঃ

  • Detailed Design ছাড়া। (ডিটেইল্ড ডিজাইনে বিভিন্ন আইটেমের ডিজাইনজনিত কারনে দৈর্ঘ্য,প্রস্থ ও পুরুত্বের পরিবর্তন ও নূতন আইটেমের অন্তরভূক্ত এবং দৈর্ঘ্য ও প্রস্থের বৃদ্ধি যেমন ষ্টেশনের দৈর্ঘ্য ২৫০ মিটার ~৬৫০ মিটার (নূতন বাজার ষ্টেশন)।ডিটেইল্ড ডিজাইনে ডায়াফারম ওয়ালের পুরুত্ব ১ মিটারের স্থলে ১.৫০ মিটার। ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার জন্য ডাইভার রাস্তা নির্মাণ ও ক্ষতিগ্রস্ত বিভিন্ন স্থাপনা পুনঃনির্মাণ ইত্যাদি বিবেচনা করা হয়েছে ।)
    • ভূতাত্ত্বিক বিস্তারিত জরিপের আগে
    • ঝুঁকি বিশ্লেষণ ও পূর্ণাঙ্গ কাজের পরিধি নির্মাণের পূর্বে

আন্তর্জাতিকভাবে এটা স্বীকৃত যে, বিস্তারিত নকশা বা ডিটেইল ডিজাইন ও দরপত্র প্রক্রিয়া সম্পাদনের পরে প্রকৃত ব্যয় নির্ধারণ হয়। কাজেই প্রায় ৮ বছর আগের ধারণাগত ব্যয়ের সাথে দরপত্রে বর্তমান উদ্ধৃত দর তুলনা করা বাস্তবসম্মত নয়।

১৩. লাইন-৬ এর সাথে তুলনা: –

বাংলাদেশের প্রথম মেট্রোরেল লাইন-৬ (উত্তরা-মতিঝিল) সম্পূর্ণ উড়ালপথ হিসেবে নির্মিত যা নির্মাণ তুলনামূলক সহজ ও কম ঝুঁকিপূর্ণ। অন্যদিকে লাইন ১ ও ৫ নর্থ লাইনদুটিঃ

  • বেশিরভাগ অংশ পাতাল
    • ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় নির্মিত হবে
    • নরম মাটি ও High Water Table এর চ্যালেঞ্জ রয়েছে
    • ইউটিলিটি স্থানান্তর

কাজেই এই দুটি লাইন নির্মাণে অত্যাধুনিক প্রযুক্তির টানেল বোরিং মেশিন (TBM), গ্রাউন্ড ট্রিটমেন্ট ও অন্যান্য আধুনিক প্রযুক্তির প্রয়োজন হবে। লাইন-৬ নির্মাণে মোট ব্যয় দাঁড়িয়েছে ৩৩,০০০ কোটি টাকা। আন্তর্জাতিক নিয়মানুযায়ী, পাতাল মেট্রোরেলের ব্যয় সাধারনত উড়াল বা এলিভেটেড অপেক্ষা ৩-৫ গুণ পর্যন্ত হতে পারে।

১৪.“যোগসাজশ” অভিযোগ:

কিছু প্যাকেজের উচ্চ দরপত্র দেখে যোগসাজশ অভিযোগ তোলা হলেও

  • পুরো প্রক্রিয়া Japan International Cooperation Agency এর কঠোর নীতিমালা অনুযায়ী পরিচালিত হয়েছে
    • প্রতিটি পর্যায়ে স্বচ্ছতা ও প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করা হয়েছে

১৫. “প্রকল্প আত্মঘাতী”-দাবী কি যুক্তিসঙ্গত ? : –

এই ধরণের মন্তব্য মোটেও তথ্যনির্ভর নয় বরং আবেগপ্রসূত, অনুমাননির্ভর ও বিশেষ কোন উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য বয়ান তৈরির অপচেষ্টা। কেননা বাস্তবে

  • প্রকল্পের EIRR ইতিবাচক অর্থাৎ এই প্রকল্পে বিনিয়োগের দীর্ঘমেয়াদী ফলাফল দেশের জন্য অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক
    • দীর্ঘমেয়াদে এটি জাতীয় সম্পদ এ প্রকল্প
    • যানজট কমাবে (দেশে যানজটের কারণে প্রতিবছর ৩.৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়, ২০১৩ সালের সমীক্ষা)
    • ব্যবহারকারীদের সময় সাশ্রয় করবে
    • পরিবেশগত উন্নতি ঘটাবে যা দেশের কার্বন ক্রেডিটের লক্ষ্যমাত্রা পূরণে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে
    • অর্থনৈতিক উৎপাদনশীলতা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে

১৬. সমজাতীয় অন্যান্য প্রকল্পের সাথে ব্যয়ের তুলনা: –

• ঢাকা-$২১৮ মিলিয়ন/কিমি

• ম্যানিলা-$২১৪ মিলিয়ন/কিমি

• জাকার্তা-$২২৫ মিলিয়ন/কিমি

• সিঙ্গাপুর-$৫২৩ মিলিয়ন/কিমি

আঞ্চলিক তুলনায় ঢাকার আন্ডারগ্রাউন্ড মেট্রোর ব্যয়ও প্রতিযোগিতামূলক। প্রতি কিলোমিটারে ব্যয় প্রায় ২১৮ মিলিয়ন ডলার, যা ম্যানিলা ও জাকার্তার কাছাকাছি এবং সিঙ্গাপুরের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম।

আন্ডারগ্রাউন্ড মেট্রোর প্যাকেজ সিপি-০৪, সিপি-০৫ এবং সিপি-০৬-এর উন্মুক্তকৃত আর্থিক প্রস্তাবের মূল্যায়নের ভিত্তিতে প্রতি কিলোমিটারে নির্মাণ ব্যয় ১৯৯ মিলিয়ন মার্কিন ডলার।

১৭. বাস্তবায়নাধীন আন্তর্জাতিক আন্ডারগ্রাউন্ড মেট্রো প্রকল্পের সাথে এমআরটি লাইন-১ এর ব্যয়ের তুলনামূলক বিশ্লেষণ

* ঢাকা এমআরটি লাইন-1 (আন্ডারগ্রাউন্ড) ফর সিপি-04, সিপি-05 এবং সিপি-06 >দৈর্ঘ্য: 12.90 কিমি; Total Cost:6.11 বিলিয়ন ইউএসডি ডলার; প্রতি কিলোমিটার কস্ট:199 মিলিয়ন ইউএসডি ডলার (2026~2031).

* সিঙ্গাপুর TEL (Thomson -East Coast line: Deep tunneling advanced Safely)> Length :4.3 কিমি; Total Cost: 18.5 বিলিয়ন ইউএসডি ডলার; প্রতি কিলোমিটার Cost: 430 মিলিয়ন ইউএসডি ডলার (2014~2025)

* Sydney Metro City and Southwest > Length 30km (15.50km underground); Total Cost: 14.0 বিলিয়ন ইউএসডি ডলার; প্রতি কিলোমিটার Cost: 677মিলিয়ন ইউএসডি ডলার (2017~2025), O ngoing. Higher Cost due to global inflation etc.

* Melbourne Metro Tunnel > Length :9 km; Total Cost: 10 বিলিয়ন ইউএসডি ডলার; প্রতি কিলোমিটার Cost: 1000 মিলিয়ন ইউএসডি ডলার (Expected Opening 2017~2025); Higher Cost due to global inflation etc.

* Ho Chi Minh City Line-1, Mostly Elevated > Length 19.7 (Partly Underground); Total Cost: 1.7~2.5 বিলিয়ন ইউএসডি ডলার; প্রতি কিলোমিটার Cost: 85~125 মিলিয়ন ইউএসডি ডলার (2008~2025 Completed)

১৮. এমআরটি লাইন-১ এর ব্যয়ের যৌক্তিকতা:

বাংলাদেশে প্রথম আন্ডারগ্রাউন্ড মেট্রো: টানেলিং প্রযুক্তি, বিশেষায়িত সিস্টেম এবং সংশ্লিষ্ট নির্মাণ দক্ষতা প্রথমবারের মতো দেশে আনতে বড় অংকের প্রাথমিক মোবিলাইজেশন ব্যয়ের প্রয়োজন হবে।

ভূতাত্ত্বিক চ্যালেঞ্জ: ঢাকার নরম মৃত্তিকা, উচ্চ ভূগর্ভস্থ পানির স্তর এবং বন্যা-ঝুঁকি প্রকৌশলগতভাবে মোকাবেলার প্রয়োজনে নির্মাণ ব্যয় বৃদ্ধি পাবে।

আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা মানদণ্ডঃ এমআরটি লাইন-১ এর ডিজাইনে অগ্নি নিরাপত্তা, বন্যা প্রতিরোধ, জরুরি বিদ্যুৎ ব্যবস্থা এবং প্ল্যাটফর্ম স্ক্রিন ডোরসহ উন্নত বিশ্বমানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়েছে।

মুদ্রার বিনিময় হারঃ ২০১৯ সাল থেকে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশি টাকা (BDT) ডলারের তুলনায় প্রায় ৪৪.৩% অবমূল্যায়িত হয়েছে, যার ফলে আমদানিকৃত পণ্যের ও বৈদেশিক মুদ্রায় চুক্তিভিত্তিক ব্যয়ের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

ক্রয় ব্যয় বৃদ্ধি: মেট্রো রেলের জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি, রোলিং স্টক, সিগন্যালিং সিস্টেম এবং নির্মাণসামগ্রী বাংলাদেশে উৎপাদিত না হওয়ায়, বিদেশ থেকে আমদানি করতে হচ্ছে। এর ফলে প্রকল্পের ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে। এছাড়া আন্তর্জাতিক দরপত্রে ব্যবহৃত মার্কিন ডলার ও জাপানি ইয়েনের বিপরীতে টাকার দুর্বলতা ব্যয় আরও বাড়িয়েছে।

এমআরটি-১ এর আন্ডারগ্রাউন্ড অংশের ব্যয় প্রতি কিলোমিটারে ১৯৯ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা সিঙ্গাপুর, সিডনি এবং মেলবোর্নের তুলনায় কম। হো চি মিন সিটির সঙ্গে তুলনীয়: নেল ও স্টেশন নির্মাণ ব্যয় অন্তর্ভুক্ত করলে ঢাকার ব্যয় দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সমমানের প্রকল্পগুলোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

উচ্চ ব্যয় মানে অদক্ষতা নয়: তুলনামূলক বেশি ব্যয় মূলত প্রথমবারের মোবিলাইজেশন, জটিল ভূতাত্ত্বিক অবস্থা, এবং উন্নত নিরাপত্তা ও মান নিশ্চিত করাকে প্রতিফলিত করে যা অপচয় বা অদক্ষতা নয়। ঢাকার প্রকৌশল ও আর্থিক চ্যালেঞ্জ বিবেচনায় প্রতি কিলোমিটারে ১৯৯ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয় যৌক্তিক ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী তুলনাযোগ্য। ঢাকার আন্ডারগ্রাউন্ড মেট্রো ভবিষ্যৎমুখী এবং জনগণের জন্য নিরাপদ সেবা নিশ্চিতে নির্মিত প্রকল্প।

মেট্রোরেলের লাভ-ক্ষতি নির্ণয়ে সরাসরি আর্থিক বিশ্লেষণের পরিবর্তে দেশের বৃহত্তর আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের প্রেক্ষাপটে এই গণপরিবহনের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাব নির্ণয় করা বাঞ্চনীয়। পরিচালন নিট মুনাফা (Operating Net Profit) হয়তো গ্রহণযোগ্য নাও হতে পারে। তবে এক্ষেত্রে মূল বিনিয়োগের বিপরীতে নিম্নোক্ত উপাদানগুলো বিবেচিত হতে পারেঃ

ক) যানজটে নষ্ট হওয়া লাখ লাখ কর্মঘন্টার আর্থিক মূল্যে নির্ণয়পূর্বক বিবেচিত হতে পারে। জনবহুল ঢাকা ও অন্যান্য নগরে সড়কপথে গন্তব্যে পৌছানোর ভ্রমণ সময়ের অনিশ্চয়তাকে মেট্রোরেল ইতিবাচক ও উল্লেখযোগ্য ভাবে কমিয়ে আনতে পারে

খ) পরিবেশ দূষণ উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস করে তা নগর তথা সারাবিশ্বের পরিবেশ রক্ষায় বিশেষ ভূমিকা রাখতে পারে

গ) দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য একটি উপযুক্ত বিনিয়োগ পরিবেশ তৈরি করতে সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে

ঘ) ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার দৃশ্যমান উন্নতিসাধনের মাধ্যমে বিদেশীদের কাছে বাংলাদেশের মর্যাদা বৃদ্ধি করতে ভূমিকা রাখতে পারে

ঙ) উন্নত যোগাযোগ অবকাঠামো জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে সহায়ক ভূমিকা রাখবে।

চ) দ্রুত ও সময়সাশ্রয়ী গণপরিবহনব্যবস্থা হিসেবে মেট্রোরেল বাংলাদেশ সম্পর্কে উন্নয়নসহযোগী ও বিদেশী বিনিয়োগকারীদের নিকট ইতিবাচক ভাবমূর্তি রাখতে গুরুত্বপুর্ন ভুমিকা রাখতে পারে

ছ) সড়কপথের প্রচলিত যানবাহনে ব্যবহৃত জীবাশ্ম জ্বালানি ও দূষণের মাত্রা কমিয়ে মেট্রো বাংলাদেশের নগর পরিবহণকে Green Communication System এ রূপান্তরিত করতে পারে যার ফলশ্রুতিতে বাংলাদেশ কার্বন নিঃসরণ উল্লেখযোগ্য পরিমাণ কমিয়ে বিশ্বের টেকসই পরিবেশ উন্নয়নের অঙ্গীকার লক্ষ্যমাত্রা পুরণ করতে সমর্থ হয় ।

ইউরোপ, আমেরিকা, রাশিয়া, জাপান, চীন এমনকি ভারতেও আধুনিক শহরের গণ পরিবহণ ব্যবস্থা মেট্রোর উপর নিরভরশীল। ভূমির দুষ্প্রাপ্যতার কারণে এসব অধিকাংশ শহরে আন্ডারগ্রাউন্ড মেট্রো নেটওয়ার্ক বিদ্যমান। আগামী ১০ বছরের মধ্যে চট্টগ্রাম, রাজশাহীসহ অন্যান্য বড় শহরে মেট্রোরেল নির্মাণের ব্যাপারে পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। উল্লেখ্য, বিশ্বের বেশিরভাগ রেলওয়ে ও মেট্রো সিস্টেম সরকারি ভর্তুকিতে চলে, কারণ নাগরিকদের জন্য এর অগণিত পরোক্ষ সুফল রয়েছে।

ঢাকা মেট্রোরেলের মতো জটিল অবকাঠামো প্রকল্পকে অযথা বিলম্বিত করা মানে শুধু খরচ বৃদ্ধি নয়, এটি শহরের জীবনরেখাকে দুর্বল করে ফেলা। মেট্রোরেলের চুক্তি বিলম্ব হলে সময় বাড়ে, খরচ বাড়ে এবং জনসেবা ব্যাহত হয়ে জনদুর্ভোগ বহুগুণ বাড়বে।

এখন এই প্রকল্পে দরকার সাহসী সিদ্ধান্ত, বাস্তববাদী নেতৃত্ব, সময় মতো চুক্তি এবং সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার হিসেবে জনসেবাকে সামনে রাখা।

মো: আবুল কাসেম ভূঁঞা

সাবেক প্রকল্প পরিচালক

ঢাকা ম্যাস র‌্যাপিড ট্রানজিট ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট (লাইন-১)

* মতামত লেখকের নিজস্ব