― Advertisement ―

ইসলামাবাদে বরফ গলার আভাস: জব্দকৃত সম্পদ ফেরতে রাজি যুক্তরাষ্ট্র, তবে ‘গ্যারান্টি’তে অনড় ইরান

দীর্ঘদিন ধরে আটকে থাকা ইরানের বিশাল অঙ্কের জব্দকৃত সম্পদ অবমুক্ত করার বিষয়ে অবশেষে নতি স্বীকার করেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। পাকিস্তানের ইসলামাবাদে চলমান পর্দার অন্তরালের এক রুদ্ধদ্বার বৈঠকে ওয়াশিংটন এই সম্পদ ফেরত দিতে নীতিগতভাবে সম্মত হয়েছে। তবে তেহরান কেবল মৌখিক প্রতিশ্রুতিতে সন্তুষ্ট থাকতে রাজি নয়। অতীতের তিক্ত অভিজ্ঞতার প্রেক্ষাপটে ইরান এখন এই অর্থ হস্তান্তরের বিষয়টি নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য ‘গ্যারান্টি’ বা আইনি নিশ্চয়তা দাবি করছে।

শনিবার (১১ এপ্রিল ২০২৬) ইরানের প্রভাবশালী সংবাদ সংস্থা ‘তাসনিম নিউজ এজেন্সি’ তাদের ইসলামাবাদ প্রতিনিধির বরাত দিয়ে এই চাঞ্চল্যকর খবরটি সামনে এনেছে। প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, গত কয়েক সপ্তাহ ধরে চলা কূটনৈতিক চাপ এবং আলোচনার টেবিলে দীর্ঘ দরকষাকষির ফলে মার্কিন প্রশাসন তাদের পূর্ববর্তী কঠোর অবস্থান থেকে সরে এসেছে। ইরানের এই বিপুল সম্পদ কয়েক বছর ধরে মার্কিন ব্যাংকিং সিস্টেমে আটকে থাকায় দেশটির অর্থনীতি বড় ধরনের সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল।

সংবাদ সংস্থাটির ‘অবগত সূত্র’ মারফত জানা গেছে, যুক্তরাষ্ট্র বিষয়টিকে কেবল প্রতিশ্রুতির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখছে না। আর্থিক বিষয়ে আলোচনার জন্য ইতিমধ্যে একটি উচ্চপর্যায়ের বিশেষজ্ঞ প্রতিনিধি দল ওয়াশিংটন থেকে ইসলামাবাদে পৌঁছেছে। এই দলটির মূল লক্ষ্য হলো দুই দেশের মধ্যে একটি টেকসই এবং বাস্তবায়নযোগ্য সমঝোতা স্মারক তৈরি করা, যাতে অর্থ হস্তান্তরের প্রযুক্তিগত জটিলতাগুলো দূর করা যায়।

তবে তেহরানের নীতিনির্ধারকদের মধ্যে এখনো এক ধরনের অবিশ্বাসের ছায়া স্পষ্ট। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র এর আগেও বহুবার আন্তর্জাতিক চুক্তিতে প্রতিশ্রুতি দিয়ে পরবর্তীতে তা লঙ্ঘন করেছে। বিশেষ করে ২০১৫ সালের পরমাণু চুক্তি থেকে একতরফাভাবে যুক্তরাষ্ট্রের সরে যাওয়ার ঘটনাটি ইরান এখনো ভুলে যায়নি। সেই তিক্ত স্মৃতি থেকেই এখন তেহরান একটি সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থা বা গ্যারান্টি চাইছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে বাধ্য করবে।

ইরান বলছে, জব্দকৃত সম্পদ হস্তান্তরের প্রক্রিয়াটি হতে হবে স্বচ্ছ এবং দ্রুত। তারা এমন একটি ব্যবস্থার দাবি করছে যেখানে তৃতীয় কোনো পক্ষ বা কোনো আন্তর্জাতিক সংস্থা গ্যারান্টার হিসেবে কাজ করবে। তেহরানের আশঙ্কা, কোনো আইনি রক্ষাকবচ ছাড়া পুনরায় এই সম্পদ অবমুক্ত করার প্রক্রিয়া শুরু করলে মাঝপথে আবারও কোনো রাজনৈতিক অজুহাতে তা স্থগিত করে দিতে পারে হোয়াইট হাউস।

ইসলামাবাদে এই আলোচনার প্রেক্ষাপটটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পাকিস্তান এখানে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করছে কি না, তা নিয়ে সরাসরি কিছু বলা না হলেও, আয়োজক দেশ হিসেবে তাদের ভূমিকা অস্বীকার করার উপায় নেই। দক্ষিণ এশিয়ার এই ভূ-রাজনৈতিক কেন্দ্রবিন্দুতে বসে ওয়াশিংটন এবং তেহরানের মধ্যে এই বরফ গলার ঘটনাটি বিশ্ব রাজনীতির প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

ইরানি সূত্রের দাবি অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র কেবল তেলের অর্থ নয়, বরং বিভিন্ন সময় জব্দ করা সামরিক এবং বাণিজ্যিক সম্পদের হিসাব নিয়েও আলোচনা করতে আগ্রহী। তবে তেহরানের পক্ষ থেকে সাফ জানানো হয়েছে, যতক্ষণ পর্যন্ত গ্যারান্টির বিষয়টি চূড়ান্ত হচ্ছে না, ততক্ষণ পর্যন্ত এই আলোচনার ফলাফলকে ‘সফল’ বলে ঘোষণা করা হবে না। ইরান চায় তাদের অর্থনীতির ওপর চাপ সৃষ্টিকারী এই আর্থিক শিকলগুলো চিরতরে খুলে দেওয়া হোক।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন সামনে রেখে বাইডেন প্রশাসন হয়তো মধ্যপ্রাচ্যে একটি স্থিতিশীলতা তৈরির চেষ্টা করছে। অন্যদিকে, ইরান তাদের অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে এই জব্দকৃত অর্থের মুখাপেক্ষী। উভয় পক্ষেরই নিজস্ব স্বার্থ থাকলেও বিশ্বাসের অভাবটি এখানে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে ইসলামাবাদে মার্কিন প্রতিনিধি দলের উপস্থিতি একটি ইতিবাচক সংকেত হলেও এর চূড়ান্ত ফল নিয়ে সংশয় রয়েই যাচ্ছে।

পরিশেষে বলা যায়, জব্দকৃত সম্পদ ফেরতের এই উদ্যোগ যদি সফল হয়, তবে তা যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি নতুন যুগের সূচনা করতে পারে। কিন্তু গ্যারান্টি ইস্যুতে ইরান যদি তাদের অবস্থানে অনড় থাকে এবং যুক্তরাষ্ট্র যদি আইনি নিশ্চয়তা দিতে ব্যর্থ হয়, তবে এই আলোচনা পুনরায় ভেস্তে যাওয়ার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। আপাতত পুরো বিশ্বের নজর এখন ইসলামাবাদের দিকে, যেখানে নির্ধারিত হচ্ছে ইরান-মার্কিন আর্থিক সম্পর্কের ভবিষ্যৎ।