মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এক ভয়াবহ মোড় নিয়েছে। মঙ্গলবার (১০ মার্চ ২০২৬) ভোরে সংযুক্ত আরব আমিরাত ও বাহরাইনসহ উপসাগরীয় আরব দেশগুলোতে নজিরবিহীন ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে ইরান। দুবাই ও বাহরাইনের আকাশে ভোরের নিস্তব্ধতা ভেঙে বেজে ওঠে ক্ষেপণাস্ত্র সতর্কতার সাইরেন। সৌদি আরব ও কুয়েত বেশ কিছু ড্রোন ভূপাতিত করার দাবি করলেও, এই হামলা আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাকে পুরোপুরি ধসিয়ে দিয়েছে। একই সময়ে উত্তর ইরাকে বিমান হামলায় ইরানপন্থী পাঁচ যোদ্ধা নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে, যা সংঘাতের বহুমাত্রিকতাকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে।
ইরান কেবল সামরিক ঘাঁটি নয়, বরং বিশ্ব অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত জ্বালানি অবকাঠামোকেও লক্ষ্যবস্তু করছে। কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী কার্যত বন্ধ করে দিয়েছে তেহরান। উল্লেখ্য যে, বিশ্বের মোট জ্বালানি তেলের প্রায় ২০ শতাংশ এই সরু নৌপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। প্রণালীর কাছে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলায় ইতিমধ্যে সাতজন নাবিক প্রাণ হারিয়েছেন। ইরানের এই পদক্ষেপে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দামে অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়েছে। সোমবার ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১২০ ডলারে উঠে গেলেও মঙ্গলবার তা ৯০ ডলারের কাছাকাছি অবস্থান করছে, যা যুদ্ধ শুরুর আগের তুলনায় ২৪ শতাংশ বেশি।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই পরিস্থিতিকে ‘স্বল্পমেয়াদী অভিযান’ হিসেবে অভিহিত করে ইরানকে চরম হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি জানান, তেলের প্রবাহ বাধাগ্রস্ত করলে ইরানকে এখন পর্যন্ত দেওয়া আঘাতের চেয়ে ২০ গুণ বেশি কঠোর জবাব দেবে যুক্তরাষ্ট্র। তবে তেহরান এই হুমকিতে পিছু হটতে নারাজ। ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর মুখপাত্র আলী মোহাম্মদ নাইনি স্পষ্ট জানিয়েছেন, যুদ্ধের সমাপ্তি কখন হবে তা ইরানই নির্ধারণ করবে। অন্যদিকে, ইরানের সর্বোচ্চ নেতার উপদেষ্টা কামাল খারাজি সাফ জানিয়েছেন, আগ্রাসন বন্ধ না হলে কূটনীতির কোনো স্থান নেই এবং ইরান দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত।
এই সংঘাতের প্রভাব কেবল রণক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নেই; বরং এটি একটি মানবিক ও অর্থনৈতিক বিপর্যয়ে রূপ নিয়েছে। সামরিক ঘাঁটি থেকে শুরু করে স্কুল ও হোটেল পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় লাখো মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে, আর বিদেশি বিনিয়োগকারীরা হন্যে হয়ে এসব ব্যবসায়িক কেন্দ্র ছাড়ছেন। লেবাননে হিজবুল্লাহ এবং ইরাকে ইরান-সমর্থিত মিলিশিয়াদের সক্রিয় অংশগ্রহণ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এখন পর্যন্ত ইরান, লেবানন ও ইসরায়েল মিলিয়ে প্রায় দেড় হাজারেরও বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন, যার মধ্যে সাতজন মার্কিন সেনাসদস্যও রয়েছেন। বৈশ্বিক আর্থিক বাজারগুলোতেও এই অস্থিরতার কম্পন অনুভূত হচ্ছে।



