― Advertisement ―

মিনাভ স্কুল ট্র্যাজেডি: আল জাজিরার অনুসন্ধানে মিলল পরিকল্পিত হামলার আলামত।

২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি, শনিবার। দক্ষিণ ইরানের উপকূলীয় শহর মিনাভের ‘শাজারেহ তাইয়েবাহ’ বালিকা বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা যখন শ্রেণিকক্ষে তাদের পাঠদানে ব্যস্ত, তখনই আকাশ থেকে নেমে আসে যমদূত। ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রাথমিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় মুহূর্তেই ধুলোয় মিশে যায় স্কুল ভবনটি। ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে ১৬৫টি নিস্পাপ প্রাণ, যাদের বেশিরভাগই ৭ থেকে ১২ বছর বয়সী শিশু। এই নৃশংসতা কেবল একটি সামরিক অভিযান নয়, বরং মানবতার ইতিহাসে এক কালো অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে রইল। আল জাজিরার এক গভীর ডিজিটাল অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে চাঞ্চল্যকর সব তথ্য, যা এই হামলাকে ‘ভুল’ নয় বরং ‘পরিকল্পিত’ হওয়ার দিকেই আঙুল তুলছে।

হামলার পরপরই ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র দাবি করেছিল যে, তারা কোনো স্কুলে হামলার বিষয়ে অবগত নয়। এমনকি কিছু সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম অ্যাকাউন্ট প্রচার করতে থাকে যে, এটি একটি সামরিক ঘাঁটির অংশ ছিল। কিন্তু আল জাজিরার ডিজিটাল ইনভেস্টিগেশন ইউনিট গত ১০ বছরের স্যাটেলাইট ইমেজ বিশ্লেষণ করে প্রমাণ করেছে যে, এই বিদ্যালয়টি সংলগ্ন সামরিক স্থাপনা থেকে সম্পূর্ণ আলাদা ছিল। ২০১৬ সাল থেকেই স্কুলটির চারপাশ দেয়াল দিয়ে ঘিরে দেওয়া হয়েছিল এবং শিক্ষার্থীদের জন্য তিনটি পৃথক প্রবেশপথ তৈরি করা হয়েছিল। অর্থাৎ, এটি যে একটি সম্পূর্ণ বেসামরিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, তা যেকোনো আধুনিক গোয়েন্দা মানচিত্রে পরিষ্কারভাবে দৃশ্যমান হওয়ার কথা।

অনুসন্ধানের সবচেয়ে চমকপ্রদ অংশটি হলো ‘শহীদ আবসালান’ ক্লিনিক। স্কুল এবং সামরিক ঘাঁটির ঠিক মাঝখানে অবস্থিত এই ক্লিনিকটি মাত্র এক বছর আগে উদ্বোধন করা হয়েছিল। অবাক করার মতো বিষয় হলো, মার্কিন-ইসরায়েলি ক্ষেপণাস্ত্রগুলো নিখুঁতভাবে সামরিক ঘাঁটি এবং স্কুলটিতে আঘাত করলেও মাঝখানের এই ক্লিনিকটিকে স্পর্শও করেনি। এর অর্থ দাঁড়ায়, আক্রমণকারীদের কাছে অত্যন্ত আধুনিক ও নিখুঁত মানচিত্র ছিল। যদি তারা এক বছর আগে তৈরি ক্লিনিকটিকে চিনতে পেরে এড়িয়ে যেতে পারে, তবে ১০ বছর ধরে চলা একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে তারা চিনতে পারবে না—এমন দাবি কেবল হাস্যকরই নয়, বরং চরম দায়িত্বজ্ঞানহীনতা।

মিনাভের এই ট্র্যাজেডি আমাদের মনে করিয়ে দেয় বাহর আল-বাকার, আমিরিয়াহ শেল্টার কিংবা কুন্দুজ হাসপাতালের কথা। প্রতিটি ক্ষেত্রেই বেসামরিক স্থাপনায় হামলার পর প্রথমে অস্বীকার এবং পরে ‘ভুল’ বা ‘মানব ঢাল’ ব্যবহারের অজুহাত দেওয়া হয়েছে। কিন্তু মিনাভের মাটিতে ছড়িয়ে থাকা ১৬৫টি নিথর দেহ আর রক্তমাখা খাতাগুলো অন্য কথা বলছে। এটি কি তবে ইরানি জনগণের মনে ত্রাস সৃষ্টি করার কোনো পরিকল্পিত কৌশল? মৃত শিশুদের শেষ বিদায় জানাতে আসা মায়েদের আহাজারিতে আজ মিনাভের বাতাস ভারি। হাসপাতালের মর্গে জায়গা না হওয়ায় ভ্রাম্যমাণ ফ্রিজার ভ্যানে রাখা হয়েছে ছোট ছোট কফিনগুলো। সভ্য জগতের দাবিদার দেশগুলোর এই ‘ভুল’ কি আদৌ কোনোদিন ক্ষমার যোগ্য হবে?