বাচ্চাদের প্রিয় গুঁড়া দুধ তৈরি হচ্ছে ভেজাল ‘হয়ে পাউডার’ দিয়ে। হয়ে পাউডার মূলত এক ধরনের সাদা পাউডার। যার মধ্যে দুগ্ধ উপাদান খুবই সামান্য। সম্প্রতি ল্যাব টেস্টে গোয়ালিনী নামের একটি গুঁড়া দুধে মাত্র ১৭ শতাংশ দুগ্ধ উপাদান পাওয়া গেছে। বাকি অন্তত ৬৭ শতাংশ ভেজাল উপাদান।
প্রত্যেক বাবা-মাই তাঁর সন্তানের স্বাস্থ্যের কথা বিবেচনা করে একটু নিরাপদ ও ভাল মানের খাবার খোঁজেন। ভালো ব্র্যান্ডের খাদ্যপণ্যকে নিরাপদ মনে করেন তারা। কিন্তু ‘ভালো ব্র্যান্ডের’ খাবারেও এখন ক্ষতিকর উপাদান মিলছে। যেসব পণ্য মানুষ চোখ বন্ধ করে বাচ্চাদের জন্য কিনছেন তাতেও ভেজাল উপকরণ পাওয়া যাচ্ছে।
প্যাকেটের গায়ে পুষ্টিগুণের তালিকা দেয়া থাকলেও এসব পণ্য ল্যাবে পরীক্ষা করে তালিকার সঙ্গে মিল পাওয়া যায়নি। এমনকি স্ট্যান্ডার্ড মানের সঙ্গেও উপাদানের অনেক তফাত পেয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
অনুসন্ধান বলছে, সস্তার ‘হয়ে পাউডার’ মিশিয়ে চকচকে মোড়কে বাজারে বিক্রি হচ্ছে বাহারি মিল্ক পাউডার। আদালতে প্রমাণ হওয়ার পরও আইনের ফাঁক-ফোকর গলে সামান্য শাস্তিতেই পার পেয়ে যাচ্ছে এর সাথে জড়িত ব্যবসায়ীরা।
ক্রেতাদের বোঝার উপায় নেই যে, গুঁড়া দুধের নামে তারা বাচ্চাদের ‘হয়ে পাউডার’ খাওয়াচ্ছেন। এরকম অনেক মানহীন শিশুখাদ্য বাজারে ছড়িয়ে পড়ছে। ভেজাল খাদ্যের ব্যাপারে সরকারের তৎপরতাও খুবই সামান্য।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এসব পণ্য সরকার নির্ধারিত মান নিশ্চিত না করেই বাজারজাত করা হচ্ছে। সরকারি নিয়ন্ত্রণ সংস্থাগুলোর উদাসীনতায় আইন থাকলেও কার্যকরী হচ্ছে না। প্রস্তুতকারক, আমদানিকারক, বিক্রেতা কাউকে উল্লেখযোগ্য শাস্তি দেওয়া যাচ্ছে না।
তবে সম্প্রতি বেশ কয়েকটি শিশুখাদ্যে ভেজাল প্রমাণিত হওয়ায় খাদ্য আদালতে মামলা হয়েছে। মামলার নথি ঘেঁটে দেখা গেছে, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মামলা ও জরিমানা করা হয়। বিদেশি পণ্যের আমদানিকারকদের শাস্তি দেওয়া হলেও প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়ন্ত্রণহীন।
সংশ্লিষ্টরা আরো বলছেন, দীর্ঘ অনুসন্ধানের জন্য যে ধরনের লজিস্টিক সাপোর্ট ও জনবল দরকার, তা এ খাতে নেই বললেই চলে। এছাড়া বিদেশি ব্র্যান্ডের পণ্যের উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়াও সম্ভব হচ্ছে না।
গোয়ালিনী নামের একটি গুঁড়া দুধে দুগ্ধ চর্বির পরিমাণ থাকার কথা ছিল ৪২ শতাংশ। কিন্তু রাসায়নিক পরীক্ষায় এর পরিমাণ পাওয়া গেছে মাত্র ৭ দশমিক ৫৮ শতাংশ। অর্থাৎ ৩৪ দশমিক ৪২ শতাংশই ভেজাল উপাদান। দুগ্ধ প্রোটিন কমপক্ষে ৩৪ শতাংশ থাকার কথা থাকলেও পাওয়া গেছে মাত্র ৯ দশমিক ৫০ শতাংশ। এখানে ভেজালের পরিমাণ ২৪ দশমিক ৫০ শতাংশ।
‘গোয়ালিনী ডেইলি ফুলক্রিম মিল্ক পাউডার’ নিম্নমানের উপকরণ দিয়ে তৈরির বিষয়টি প্রমাণিত হওয়ায় পণ্যগুলো বাজার থেকে প্রত্যাহার ও ৩ লাখ টাকা জরিমানা করে বিশুদ্ধ খাদ্য আদালত।
গত ১০ ডিসেম্বর স্পেশাল মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট নুসরাত সাহারা বীথি ওই আদেশ দেন। নিম্নমানের গুঁড়া দুধ সরবরাহের দায়ে এসএ গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের চেয়ারম্যান মো. সাহাবুদ্দিন আলমের নামে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছিল একই আদালত।
পরে আদালতে হাজির হয়ে দোষ স্বীকার করে ক্ষমা প্রার্থনা করেন তিনি এবং তাদের ভেজাল পণ্য বাজার থেকে তুলে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। গত ডিসেম্বর মাসে গোয়ালিনী গুঁড়া দুধের কিছু প্যাকেট ধ্বংস করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
তদন্তকারী কর্মকর্তারা বলছেন, শুধু গোয়ালিনীই নয়, আসলাম টি কোম্পানির ফুল ক্রিম মিল্ক পাউডার, একই কোম্পানির পূর্ণ ননিযুক্ত গুঁড়া দুধ, ডানো ফুল ক্রিম মিল্ক পাউডার, ড্যানিশ ফুল ক্রিম মিল্ক পাউডার, ইনস্ট্যান্ট ফুল ক্রিম মিল্ক পাউডার (নেসলে) ও স্টারশিপ গুঁড়া দুধ ল্যাব টেস্টে উত্তীর্ণ হয়নি। এসব গুঁড়া দুধের আমদানিকারকদের বিরুদ্ধেও মামলা করা হয়েছে।
বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান জাকারিয়া (অতিরিক্ত সচিব)বলেন, ‘শিশু খাদ্য খুবই স্পর্শকাতর। এটার মান নিয়ন্ত্রণে মাঠপর্যায়ে আমরা কাজ করে যাচ্ছি। আমরা বাজার থেকে নমুনা সংগ্রহ করে থাকি। আমাদের ল্যাবে প্রতি বছর দেড় থেকে দুই হাজার নমুনা পরীক্ষা করার সক্ষমতা আছে। ল্যাবের সক্ষমতা আরও বাড়াতে প্রকল্প নেওয়া হয়েছে।’
বিএসটিআইয়ের সমন্বয় কর্মকর্তা মোহাম্মদ তৌহিদুর রহমান বলেন, ‘মানহীন অনেক পণ্যে বিএসটিআইয়ের নকল লোগো দেওয়ার অভিযোগ আছে। বিষয়টি মাথায় রেখে লোগোর সঙ্গে এখন কিউআর কোড দিয়ে দেওয়া হয়।’
তিনি আরো বলেন, ‘গ্রাহকরা কিউআর কোড স্ক্যান করলে ওই পণ্য নিবন্ধিত কি না, নিশ্চিত হতে পারবেন। বিএসটিআই নিবন্ধিত কোনো পণ্যে ভেজাল প্রমাণিত হলে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়। অভিযোগ পেলে মোবাইল কোর্টও পরিচালনা করা হয়।’
সূত্র: দেশ রূপান্তর



