নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রতিদিন বাংলাদেশে জন্ম নেয় প্রায় আট হাজার শিশু। এর মধ্যে অন্তত ২০০ জন নবজাতক জন্মগত হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে ভূমিষ্ঠ হচ্ছে। বছরে এ সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় ৭৩ হাজারে। বর্তমানে হৃদরোগে আক্রান্ত শিশু রয়েছে প্রায় পাঁচ লাখ।
পরিস্থিতি এমন হলেও চিকিৎসা ব্যবস্থায় রয়েছে সংকট। দেশে পেডিয়াট্রিক কার্ডিওলজিস্ট রয়েছে মাত্র ৫৩ জন। শিশুদের হৃদরোগের অস্ত্রোপচার করতে সক্ষম পেডিয়াট্রিক কার্ডিয়াক সার্জন আছেন মাত্র ১৫ জন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চিকিৎসক ঘাটতির পাশাপাশি প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর অভাবে অনেক শিশু সময়মতো চিকিৎসা পায় না। সক্ষম পরিবারগুলো বিদেশে চিকিৎসা করাচ্ছে, কিন্তু নিম্ন ও মধ্যবিত্তরা একমাত্র দেশীয় ব্যবস্থার ওপরই নির্ভরশীল।

বিশ্বের অন্য অনেক দেশে গড়ে হাজারে ৮-১০ জন শিশু হৃদরোগ নিয়ে জন্ম নিলেও বাংলাদেশে সেই সংখ্যা অনেক বেশি। এনআইসিভিডি থেকে পাওয়া সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী দেশে বর্তমানে চার থেকে পাঁচ লাখ শিশু হৃদরোগে ভুগছে। এর মধ্যে ৯০ শতাংশ জন্মগত হৃদরোগ নিয়ে জন্মাচ্ছে।
যেমন হার্টের ছিদ্রজনিত রোগ। আর ১০ শতাংশ জন্মের পর বিভিন্ন কারণে হার্টের সমস্যায় ভুগে থাকে। যেমন–জ্বরের কারণে হার্টের ভালভ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া, হার্টে সংক্রমণ, হার্টের পেশি দুর্বল হয়ে যাওয়া। সব মিলিয়ে প্রতি বছর দেশে ৩০ থেকে ৪০ হাজার নবজাতক শিশুর হৃদরোগ শনাক্ত হচ্ছে।
দেশের মোট ১৫টি হাসপাতালে শিশুদের হৃদরোগের চিকিৎসা ব্যবস্থা রয়েছে। এর মধ্যে নয়টি ঢাকায়। পেডিয়াট্রিক কার্ডিওলজিস্টের ৩০ জন এবং ১০ জন পেডিয়াট্রিক সার্জন ঢাকার বিভিন্ন হাসপাতালে কর্মরত রয়েছেন। অর্থাৎ ঢাকার বাইরে শিশুর হৃদরোগের চিকিৎসার সুযোগ নেই বললেই চলে।
এনআইসিভিডির পেডিয়াট্রিক কার্ডিওলজির বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. আব্দুল্লাহ শাহরিয়ার বলেন, শিশুদের হৃদরোগের সমস্যা বেশ পুরনো। কিন্তু অধ্যয়নের বিষয়টি নতুন। এ কারণে বিষয়টিতে শিক্ষার্থীরা পড়তে আগ্রহী হয় না। তাছাড়া সরকারিভাবে পদ সৃষ্টিও করা হয়নি। আবার যতগুলো পদ রয়েছে সেগুলোয়ও লোক নেই। ঢাকায় কিছু চিকিৎসক থাকলেও ঢাকার বাইরের অবস্থা বেশ নাজুক।
জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট এবং হাসপাতালের পেডিয়াট্রিক কার্ডিওলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. রাশেদুল কবীর বলেন, বিভিন্ন কারণে শিশুরা জন্মগতভাবে হৃদরোগ নিয়ে পৃথিবীতে আসে। কিছু জিনগত কারণও রয়েছে। অন্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশে হৃদরোগে আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা বেশি।
তিনি আরো বলেন, আমাদের দেশে পেডিয়াট্রিক কার্ডিওলজিস্টের সংখ্যা কম। এর মধ্যে পেডিয়াট্রিক কার্ডিয়াক সার্জন আরো কম। দেশে এ রকম সার্জন আছেন মাত্র ১৫ জন। এত অল্পসংখ্যক সার্জন দিয়ে বিরাটসংখ্যক রোগীকে সেবা দেয়া সম্ভব নয়।
স্বাধীনতা পদকপ্রাপ্ত শিশু হৃদ্রোগ বিশেষজ্ঞ ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) অধ্যাপক ডা. নুরুন্নাহার ফাতেমা বেগম সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে বলেছিলেন, ‘দেশে আমার হাত ধরে ১৯৯৮ সালের দিকে পেডিয়াট্রিক কার্ডিওলোজি সাবজেক্ট শুরু হয়। তখন অনেকে বলতো দেশে শিশু হার্টের রোগী নেই। তবে এখন অনেক রোগী দেখি, চিকিৎসকও আছে। তবে এখনো অনেক নবজাতক হার্টের সমস্যায় মারা যাচ্ছে।’
নুরুন্নাহার ফাতেমা বেগম আরো বলেছেন, বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে সুপার স্পেশালাইলজ হাসপাতাল রয়েছে যেখানে কোটি টাকার চিকিৎসা সরঞ্জাম অবহেলায় নষ্ট হচ্ছে। অথচ আমরা যাকাতের টাকা সংগ্রহ করে শিশুদের হার্টের চিকিৎসা করছি।’
তিনি বলেন, ‘প্রতিটি কলেজে শিশু কার্ডিলোজি বিভাগ খুলে নিয়মিত স্ক্রিনিং প্রোগ্রাম, নিউনেটাল কার্ডিওলজি, নন-ইনভেসিভ করা দরকার। এজন্য অর্থ খরচ হয় না। আমাদের হাসপাতালের সমস্যা নেই কিন্তু প্রশিক্ষিত জনবলের সংকট আছে। সরকার পেডিয়াট্রিক চিকিৎসকদের জন্য ৬ মাস ও এক বছরের প্রশিক্ষণ চালু করতে পারে।’
তিনি আরো বলেন, ‘আমরা সত্যি উন্নয়নশীল দেশ সেদিনই হবো, যেদিন একজন মা গর্ভধারনের পর জানতে পারবে গর্ভের সন্তানের কোন জটিলতা নেই। হার্টের কোনো সমস্যা নেই।’



