নিজস্ব প্রতিবেদক
গত মঙ্গলবার (২৩ সেপ্টেম্বর) খাগড়াছড়িতে ১২ বছর বয়সী মারমা কিশোরীকে ধর্ষণের ঘটনার উত্তেজনা ছড়ায় পাহাড়ি জনপদ খাগড়াছড়িতে। সেখানে ধর্ষণের প্রতিবাদে বিক্ষোভ ও সড়ক অবরোধ চলাকালে ভাংচুর, অগ্নিসংযোগ এমনকি গুলিতে পাহাড়িদের মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে।
জানা যায়, মঙ্গলবার রাতে খাগড়াছড়ি সদরে এক আদিবাসী মারমা কিশোরীকে দলবদ্ধ ধর্ষণ করা হয়। রাত ৯টার দিকে প্রাইভেট পড়ে ফেরার পথে ওই কিশোরী সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয় বলে জানান কিশোরীর বাবা। রাত ১১টার দিকে অচেতন অবস্থায় একটি খেত থেকে তাকে উদ্ধার করা হয়।
কিশোরীর বাবা পরের দিন বুধবার ভোরে সদর থানায় মামলা করেন। মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়, মঙ্গলবার রাত ৯টার দিকে প্রাইভেট থেকে ফেরার পথে ওই কিশোরী সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়।
কিশোরীর বাবা বলেন, “অচেতন অবস্থায় পাওয়ার পর মেয়েকে জেলা সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সে ওই হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ধর্ষণের সাথে তিনজন জড়িত থাকার কথা জানিয়েছে। ”
এ বিষয়ে সদর থানা পুলিশ জানায়, তারা ধর্ষণের সঙ্গে জড়িত একাধিকজনকে গ্রেপ্তার করে বৃহস্পতিবার রিমান্ডে নিয়েছে। অন্যদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। পুলিশ আরো জানায়, ওই কিাশোরীর মেডিকেল টেস্ট করার পর জবানবন্দিও নেওয়া হয়েছে।
তাহলে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়লো কি কারণে:
এ ঘটনায় আন্দোলনকারীরা অভিযোগ করেন, ধর্ষণের ঘটনা আড়াল করতে সংবাদমাধ্যমকে সেন্সর করা, মামলা নিতে পুলিশের অনিহা, মামলা নিলে ডাক্তারি পরীক্ষা দেরিতে করে আলামত নষ্ট করা, দুর্বল এজাহার করে আসামির জামিন নিশ্চিত করা সহ নানা ভাবে পাহাড়িদের হয়রানি করা হচ্ছে।
তাদের অভিযোগ, ধর্ষণের ঘটনায় মারমা সম্প্রদায় বিক্ষুব্ধ হয়েছে তাই তারা বিচার চেয়ে আন্দোলন করছে। কিন্তু এখানে সহিংসতা হলো কেন? গুলিতে মারমা সম্প্রদায়ের অন্তত তিনজন মানুষ নিহত হয়েছেন এবং নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যসহ কয়েক ডজন আহত হয়েছেন।
গুইমারা উপজেলার রামেসু বাজার এলাকায় অন্তত ১০০টি দোকান, বাড়িঘর ও যানবাহনে আগুন দেওয়া হয়, যার বেশিরভাগই আদিবাসী সম্প্রদায়ের মালিকানাধীন।
বাংলাদেশ মারমা স্টুডেন্টস কাউন্সিলের খাগড়াছড়ি জেলার সভাপতি ওয়াইবাই মারমা দাবি করেন, কখনো কাউকে গ্রেপ্তার করা হলেও পরে ধর্ষকের কোনো শাস্তি হয় না, “দুই-একজন আটক হলেও শেষ পর্যন্ত কোনো ধর্ষকের শাস্তি হয়েছে এমন উদাহরণ আমার জানা নেই৷”
তার দাবি, “যারা ধর্ষণের শিকার হন, তারা সবাই আদিবাসী। কিন্তু ধর্ষক যারা, তারা আদিবাসী নয়। ফলে, ধর্ধণের শিকার নারী ও তার পরিবার রাজনৈতিকসহ নানা চাপের মুখে পড়ে।”
অপরদিকে মুসলিম সম্প্রদায়ের একটি মসজিদে আগুন দেওয়ার ঘটনায় পুরো পরিস্থিতি বদলে যায়। কে বা কারা মসজিদে আগুন দিয়েছে তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
জেলায় গত দুদিনের সহিংসতায় পাহাড়ি ও বাঙ্গালিরা পাল্টাপাল্টি অবস্থান নিয়েছিলো। গুইমারায় পাহাড়িরা তাদের দোকানপাট ও বাড়িঘরে হামলার জন্য স্থানীয় বাঙ্গালিদেরই দায়ী করেছিলো।
আবার বাঙ্গালি সংগঠনগুলোর নেতারা বাঙ্গালিদের স্থাপনায় হামলা ও লুটপাটের জন্য পাহাড়ি সশস্ত্র সংগঠনগুলোকে দায়ী করে আসছে।
খাগড়াছড়ি জেলা সিভিল সার্জন মোহাম্মদ সাবের জানিয়েছেন, গুইমারা থেকে তিনজনকে মৃত অবস্থায় খাগড়াছড়ি সদর হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়েছে।
এদিকে, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে গভীর শোক প্রকাশ করেছে। বলা হয়েছে, গুইমারায় সংঘটিত সহিংসতায় ‘দুর্বৃত্তদের’ হামলায় তিনজন পাহাড়ি মানুষ নিহত হয়েছেন এবং ১৩ জন সেনা কর্মকর্তা, যার মধ্যে একজন মেজর, এবং তিনজন পুলিশ কর্মকর্তা সহ অনেকে আহত হয়েছেন।
তবে মন্ত্রণালয় আশ্বস্ত করেছে, খুব শীঘ্রই তদন্তের পর সহিংসতায় জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
খাগড়াছড়ির জেলা প্রশাসক এ বি এম ইফতেখারুল ইসলাম খন্দকার বলেছেন, জেলার পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক করতে জেলা প্রশাসন ও আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর সবাই একযোগে কাজ করে যাচ্ছে।
সরকারের পক্ষ থেকে আজ সোমবার দুপুরে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জাহাঙ্গীর আলম বলেছেন, পরিস্থিতি নাজুক করতে ফ্যাসিস্টের দোসররা কাজ করছে। তারা অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টি করে ফায়দা হাসিলের চেষ্টা করছে।



