বরিশাল মেইল ডেস্ক: গবেষণায় দেখা যায়, মানবদেহের কোলেস্টেরলের মাত্রা থেকে শুরু করে মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর পর্যন্ত অন্ত্রের সুস্থতার গভীর প্রভাব রয়েছে। আধুনিক গবেষণার অগ্রগতির ফলে পেটের স্বাস্থ্য সম্পর্কে মানুষের সচেতনতা যেমন বেড়েছে, তেমনি এ বিষয়ে আগ্রহও বৃদ্ধি পেয়েছে।
পোলারিস মার্কেট রিসার্চের তথ্য অনুসারে, ২০২১ সালে বিশ্বব্যাপী প্রোবায়োটিকের বাজার ছয় হাজার কোটি মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে এবং ২০৩০ সাল পর্যন্ত এই বাজার প্রতি বছর সাত শতাংশের বেশি হারে বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
কেন পেটের স্বাস্থ্য গুরুত্বপূর্ণ?
অন্ত্র মানবদেহের জটিলতম অঙ্গগুলোর একটি। এটি পাকস্থলী থেকে পায়ু পর্যন্ত দীর্ঘ একটি সংযোগস্থল, যেখানে বিপুল পরিমাণ ব্যাকটেরিয়া ও অন্যান্য অণুজীব বসবাস করে। অন্ত্রের স্বাস্থ্য ভালো রাখা জরুরি কারণ এটি পরোক্ষভাবে মস্তিষ্ক, হৃদযন্ত্র এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার ওপর প্রভাব ফেলে। গবেষণায় দেখা গেছে, অন্ত্রের অস্বাভাবিকতা মস্তিষ্কের বিকাশে বাধা সৃষ্টি করতে পারে এবং এটি আচরণ ও মানসিক অবস্থাকে প্রভাবিত করতে পারে।
অন্ত্র ও মস্তিষ্কের সংযোগ
অন্ত্রকে প্রায়ই ‘দ্বিতীয় মস্তিষ্ক’ বলা হয় কারণ এটি মস্তিষ্কের সঙ্গে সরাসরি সংযুক্ত। অন্ত্রের ব্যাকটেরিয়াগুলো মস্তিষ্কের প্রায় ১০ কোটি নিউরনের মাধ্যমে আমাদের আচরণ ও অনুভূতিকে প্রভাবিত করতে পারে। নিউরোট্রান্সমিটার, যেমন সেরোটোনিন, অন্ত্রেই উৎপন্ন হয় যা আমাদের মেজাজ ও আবেগ নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
অন্ত্রের স্বাস্থ্য কীভাবে ভালো রাখা যায়?
অন্ত্রের স্বাস্থ্য ভালো রাখার জন্য গবেষকরা পরামর্শ দেন, সুষম ও পুষ্টিকর খাদ্যাভ্যাস বজায় রাখা উচিত। আমেরিকান গাট প্রজেক্টের গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতি সপ্তাহে অন্তত ৩০ ধরনের ভিন্ন ভিন্ন উদ্ভিজ্জ খাবার খাওয়া অন্ত্রের স্বাস্থ্য উন্নত করতে পারে। এর মধ্যে ফল, সবজি, বীজ, বাদাম ও মশলা অন্তর্ভুক্ত।
ডা. মেগান রসি বলেন, ‘খাবারের রেসিপিতে সামান্য পরিবর্তন আনলেই অন্ত্রের স্বাস্থ্য ভালো করা সম্ভব। যেমন, সকালের নাস্তায় শুধুমাত্র ওটসের পরিবর্তে কুইনোয়া ও ওটসের মিশ্রণ ব্যবহার করা যেতে পারে।’
আঁশযুক্ত খাদ্য কেন গুরুত্বপূর্ণ?
যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিস (NHS) প্রাপ্তবয়স্কদের প্রতিদিন অন্তত ৩০ গ্রাম ফাইবার গ্রহণের পরামর্শ দেয়। ফাইবার সমৃদ্ধ খাবার যেমন হোল গ্রেইন রুটি, বাদামি চাল, মটরশুঁটি, লাল শাক ও বিভিন্ন শস্যজাতীয় খাবার হজম প্রক্রিয়াকে উন্নত করে এবং কোষ্ঠকাঠিন্য রোধ করতে সহায়তা করে।
মানসিক চাপ ও অন্ত্রের স্বাস্থ্য
মানসিক চাপ অন্ত্রের স্বাভাবিক কার্যকারিতাকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে, অতিরিক্ত মানসিক চাপ অন্ত্রে ভালো ব্যাকটেরিয়ার সংখ্যা কমিয়ে দিতে পারে এবং অ্যাসিড রিফ্লাক্স বা পেটে গ্যাস সৃষ্টি করতে পারে। তাই মানসিক প্রশান্তির জন্য পর্যাপ্ত ঘুম ও মেডিটেশন গুরুত্বপূর্ণ।
প্রোবায়োটিক ও অন্ত্রের স্বাস্থ্য
প্রোবায়োটিক এমন কিছু খাবার যা অন্ত্রের ভালো ব্যাকটেরিয়ার বৃদ্ধিতে সাহায্য করে। কলা, পেঁয়াজ, রসুন, ওটস, ব্লুবেরি, আঙুর ও দই অন্ত্রের ব্যাকটেরিয়ার ভারসাম্য রক্ষায় কার্যকর। তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে বাজারে প্রচলিত অনেক প্রোবায়োটিক পণ্য যথাযথ গবেষণা দ্বারা প্রমাণিত নয়। তাই অপ্রয়োজনীয় প্রোবায়োটিক সাপ্লিমেন্টের পরিবর্তে প্রাকৃতিক খাবারের মাধ্যমে অন্ত্রের স্বাস্থ্য রক্ষা করা উত্তম।
খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন ও দীর্ঘমেয়াদী স্বাস্থ্য
গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজিস্ট ডা. হানিশা খেমানি বলেন, ‘বিশের কোঠায় সুস্থ খাদ্যাভ্যাস গড়ে তুললে পরবর্তী জীবনে দীর্ঘস্থায়ী রোগ প্রতিরোধ করা সহজ হবে।’ ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং বা একটানা ১২ ঘণ্টা না খাওয়া অন্ত্রের ব্যাকটেরিয়ার ভারসাম্য রক্ষায় সাহায্য করতে পারে।
অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবার এড়িয়ে চলুন
অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবার, অ্যালকোহল ও ধূমপান অন্ত্রের জন্য ক্ষতিকর। রাস্তার খাবারও পরিচ্ছন্ন না হলে অন্ত্রে ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। তাই স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস ও পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা জরুরি।
অন্ত্রের স্বাস্থ্য শুধু হজমের সাথে সম্পর্কিত নয়, এটি আমাদের সার্বিক সুস্থতার ওপর গভীর প্রভাব ফেলে। সুষম খাদ্যাভ্যাস, পর্যাপ্ত ফাইবার গ্রহণ, মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ, প্রোবায়োটিক সমৃদ্ধ খাবার খাওয়া এবং প্রক্রিয়াজাত খাবার এড়িয়ে চলার মাধ্যমে অন্ত্রের স্বাস্থ্য নিশ্চিত করা সম্ভব। সুস্থ অন্ত্রই সুস্থ জীবনের মূল চাবিকাঠি।
বিবিসি অবলম্বনে- বিশেষ প্রতিনিধি
বিএম/জ/রা



