মগবাজারের আদ-দ্বীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে একসঙ্গে ছয় নবজাতকের অনাকাঙ্ক্ষিত ও মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনার তদন্তে এক নজিরবিহীন ও বিস্ফোরক অনিয়মের চিত্র সামনে এসেছে। শনিবার (৩০ মে, ২০২৬) বিকেল ৫টার দিকে ঘটনার প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানে হাসপাতাল ও সংশ্লিষ্ট স্থাপনাগুলো সরেজমিনে পরিদর্শনে যান দেশের নবনিযুক্ত স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বকুল। পরিদর্শনকালে মেডিকেল কলেজ ভবনের ছাদের ওপর একটি পুরোদস্তুর বেকারি কারখানা সচল দেখে তিনি চরম ক্ষোভ ও উষ্মা প্রকাশ করেন। একটি স্পর্শকাতর চিকিৎসা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাদে কীভাবে এমন বাণিজ্যিক ও ঝুঁকিপূর্ণ কারখানা পরিচালিত হতে পারে, তা নিয়ে স্বাস্থ্য প্রশাসন ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর মধ্যে তীব্র তোলপাড় শুরু হয়েছে।
পরিদর্শনকালে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সাখাওয়াত হোসেন বকুল বেকারি কারখানাটির ভেতরের পরিবেশ ও বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি খুঁটিয়ে দেখেন। যদিও তিনি এ বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে গণমাধ্যমের সামনে কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য দেননি, তবে হাসপাতাল ও কলেজ কর্তৃপক্ষকে চরম হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। একটি মেডিকেল কলেজ ভবনের ছাদে বাণিজ্যিক বেকারি স্থাপনের জন্য পরিবেশ অধিদপ্তর, জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর এবং সিটি কর্পোরেশনসহ সংশ্লিষ্ট যাবতীয় সরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে কোনো বৈধ অনুমতিপত্র বা ছাড়পত্র নেওয়া হয়েছিল কি না, তা আগামীকালের (রোববার) মধ্যে মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণ কক্ষে জমা দেওয়ার জন্য তিনি হাসপাতাল প্রশাসনকে কঠোর নির্দেশ প্রদান করেছেন।
এদিকে উদ্ভূত পরিস্থিতির মুখে নিজেদের পিঠ বাঁচাতে এক অদ্ভুত ও দায়সারা সাফাই গেয়েছে আদ-দ্বীন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। তাদের দাবি, এই বিতর্কিত বেকারিটি সরাসরি মূল হাসপাতালের সীমানার ভেতরে নয়, বরং হাসপাতাল-সংলগ্ন আদ-দ্বীন মেডিকেল কলেজের পাশে অবস্থিত। কর্তৃপক্ষ আরও দাবি করেছে যে, এই কারখানা থেকে মূলত হাসপাতালে ভর্তি থাকা রোগীদের জন্য ডায়েট ফুড বা খাবার প্রস্তুত ও সরবরাহ করা হতো। তবে হাসপাতাল ও শিক্ষা ভবনের সাথে একেবারে গা ঘেঁষে এবং ছাদে এমন উচ্চ তাপমাত্রার বৈদ্যুতিক ওভেন সংবলিত কারখানা পরিচালনা করা যে চরম অগ্নিঝুঁকি ও পরিবেশগত বিপর্যয় তৈরি করেছে, তা নিয়ে ইতিমধ্যে বিভিন্ন মহলে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে।
এর আগে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী স্পষ্ট জানান, ছয়টি নিষ্পাপ শিশুর আকস্মিক মৃত্যুর ঘটনাটি জনমনে গভীর উদ্বেগ ও তীব্র ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। এই ঘটনার প্রকৃত কারণ উদঘাটনে গঠিত উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটিকে আগামী ৩ জুনের মধ্যে চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার জন্য কড়া সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস এই ঘটনাকে অত্যন্ত দুঃখজনক আখ্যা দিয়ে বলেন, “আদ-দ্বীনের মতো একটি মেডিকেল কলেজের ভবনের ওপর কীভাবে এমন বেকারি পরিচালিত হচ্ছে, তা গুরুত্বের সাথে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এটি মূলত উচ্চ ভোল্টেজের বৈদ্যুতিক ওভেনের মাধ্যমে চলে, যা এনআইসিইউ-এর মতো ক্রিটিক্যাল জোনের বিদ্যুৎ লাইনে ও পরিবেশগত সুরক্ষায় প্রভাব ফেলতে পারে। মেডিকেল ভবনের ওপর এমন কারখানার কোনো বৈধ অনুমোদন থাকার কথাই নয়।”



