নিজস্ব প্রতিবেদক
রাজধানীর মিরপুরের শিয়ালবাড়ি এলাকার আলম ট্রেডার্সের রাসায়নিক গুদামে আগুনে ১৬ জনের মৃত্যুর পর উন্মোচন হলো দেড় দশক ধরে চলা অবৈধ রাসায়নিক ব্যবসার কথা। ঘটনার পর এগারো দিন পেরিয়ে গেলেও গুদামের মালিক শাহ আলম লাপাত্তা রয়েছেন।
স্থানীয় ও শ্রমিকদের মতে, আলম ১৫ বছর ধরে অবৈধ রাসায়নিক ব্যবসা পরিচালনা করছিলেন এবং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ব্যবসা সম্প্রসারণ করলেও তাকে কোনো প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়তে হয়নি।
পুলিশ বলছে, ওই এলাকায় আরও দুটি গুদাম খুঁজে পাওয়া গেছে এবং সব রাসায়নিক ব্যবসায়ী আত্মগোপনে চলে গেছেন। আগুনের পর বিষাক্ত ধোঁয়া কয়েকদিন স্থায়ী হয়ে স্বাস্থ্যঝুঁকি সৃষ্টি করেছিল। নিহতদের পরিবারের পক্ষ থেকে মৃত্যু-অবহেলার অভিযোগে আলমসহ আটজনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়েছে।
স্থানীয়দের তথ্য অনুযায়ী, আলম এ অঞ্চলে তিনটি আবাসিক ভবন ও তিনটি বাণিজ্যিক প্লটের মালিক এবং নিজে দ্বিতীয় তলায় বসবাস করতেন। রাসায়নিক ব্যবসা তিনি অফিস থেকে পরিচালনা করতেন, যা তার আবাসনের মাত্র ১০০ গজ দূরে ছিল। এলাকাটি ঘনবসতিপূর্ণ শিল্পাঞ্চল, যেখানে গার্মেন্টস, প্রিন্টিং প্রেস, ধোয়া ও প্যাকেজিং কারখানা ও রাসায়নিক গুদাম রয়েছে।

অগ্নিকাণ্ডে নিহত পোশাক শ্রমিক সানোয়ার হোসেনের ভাই সাইফুল ইসলাম অবহেলার কারণে মৃত্যুর অভিযোগ এনে ব্যবসায়ী আলমসহ আটজনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছেন। সেই মামলার তদন্ত করছে পুলিশ।
এই মর্মান্তিক ঘটনার এগারো দিন পরও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এখনও ৬০ বছর বয়সী শাহ আলম নামের ওই ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি। আলমের বাড়ির নিরাপত্তারক্ষী রফিকুল ইসলাম বলেন, ঘটনার দিন বিকেলে আলম ও তার পরিবার ভবন থেকে বেরিয়ে যায় এবং তারপর থেকে আর ফিরে আসেনি।
রূপনগর থানার পরিদর্শক (ওসি তদন্ত) মোখলেছুর রহমানের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, তারা আলমকে খুঁজছেন কিন্তু এখনও তাকে খুঁজে পাননি।
তিনি আরো বলেন, ‘আমরা পাশের গলিতে আরও দুটি রাসায়নিক গুদাম খুঁজে পেয়েছি। এলাকার সমস্ত রাসায়নিক ব্যবসায়ীরা পলাতক, তাদের ব্যবসা কীভাবে পরিচালিত হচ্ছিল তারও তদন্ত চলছে।’
গত এক সপ্তাহ ধরে এলাকাটি পরিদর্শন ও পর্যবেক্ষণ করেছে গণমাধ্যম কর্মীরা। তারা বেশ কয়েকজন বাসিন্দা এবং শ্রমিকের সাথে কথা বলেছেন। আব্দুল মোতালিব নামে একজন শ্রমিক নেতা, যিনি দির্ঘদিন ধরে ওই এলাকায় বসবাস করেছেন।
তিনি বলেন, ‘চার দশক ধরে এই এলাকায় বসবাস করছেন আলম। আমি তাকে ২০ বছর ধরে চিনি। প্রায় ১৫ বছর আগে তিনি ৪ নম্বর সড়কে রাসায়নিকের গুদামটি স্থাপন করেছিলেন। কয়েক বছর পরে, তিনি এটিকে পরবর্তী সড়কে স্থানান্তরিত করেন।’
স্থানীয়রা বলছেন, আলম প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত ব্যবসার কাজ করতেন। তিনি আশুলিয়া, সাভার, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ এবং ঢাকার বিভিন্ন স্থানে ক্রেতাদের কাছে রাসায়নিক সরবরাহ করতেন। প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের প্রায়শই তার অফিসে আসতে দেখা যেত।
আলম প্রশাসনের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করতেন কিনা জানতে চাইলে ওসি মোখলেসুর জানান, তিনি থানায় নতুন এসেছেন এবং এ বিষয়ে তিনি কিছু জানেন না।
এই দুর্ঘটনার তদন্ত করছেন সাত সদস্যের একটি কমিটি। সেই কমিটিকে ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। এ ছাড়াও আরও দুটি তদন্ত সংস্থাও এই দুর্ঘটনার তদন্ত করছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে তদন্ত কমিটির সদস্য ফায়ার সার্ভিসের উপ-পরিচালক মোহাম্মদ সালেহ উদ্দিন বলেন, আলম ট্রেডার্সের কাছে ব্যবসা পরিচালনার জন্য কোনও নথি বা অনুমোদন ছিল না।
তিনি আরো বলেন, ‘আমরা শাহ আলমের বক্তব্য শোনার জন্য তাকে খুঁজে বের করার চেষ্টা করছি কিন্তু এখনও তাকে খুঁজে পাইনি। তিনি যে রাসায়নিকগুলি বিক্রি করতেন, তা মূলত গাছপালা ধোয়ার জন্য ব্যবহৃত হত।’



