ভারত মহাসাগরের নীল জলরাশি যখন রণতরি ‘দেনা’র সলিল সমাধির সাক্ষী হয়েছিল, তখন কেউ ভাবেনি সেই বিষাদের শেষ অঙ্কটি রচিত হবে শ্রীলঙ্কার মাটি থেকে। শুক্রবার ৪৫ জন ইরানি নাবিকের নিথর দেহ যখন দূতাবাসের কাছে হস্তান্তর করা হলো, তখন তা কেবল একটি দেশের সামরিক ক্ষতি হিসেবে নয়, বরং আধুনিক যুদ্ধের এক ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় হিসেবে সামনে এলো। বিশাখাপত্তনমের নৌ-মহড়ায় অংশ নিয়ে শান্তির যে বার্তা দিতে চেয়েছিল এই তরুণেরা, ঘরের ফেরার পথে মার্কিন টর্পেডোর আঘাতে তা চিরতরে স্তব্ধ হয়ে গেল।
শ্রীলঙ্কার জন্য এই পরিস্থিতি সামাল দেওয়া ছিল এক বিশাল চ্যালেঞ্জ। গ্যালের কারাপিটিয়া ন্যাশনাল হাসপাতালের মর্গে জায়গা না হওয়া আর অস্থায়ী শীতলীকরণ ব্যবস্থায় মরদেহগুলো আগলে রাখার নেপথ্যে ছিল এক করুণ আকুতি। একদিকে মৃত সহকর্মীদের বিদেহী আত্মা, অন্যদিকে ৩২ জন সৌভাগ্যবান জীবিত নাবিকের হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে থাকা—সব মিলিয়ে শ্রীলঙ্কার দক্ষিণাঞ্চলীয় জনপদটি যেন এক শোকের উপত্যকায় পরিণত হয়েছিল।
মাত্তালা রাজাপাকসে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে যখন মরদেহগুলো তেহরানের উদ্দেশ্যে উড়াল দেবে, তখন ভারত মহাসাগরের তীরে পড়ে থাকবে কেবল কিছু অমীমাংসিত প্রশ্ন। রাজনৈতিক শক্তি প্রদর্শন আর সামরিক কৌশলের যাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে আর কত প্রাণ এমন অসময়ে ঝরে যাবে? এই ট্র্যাজেডি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, মানচিত্রের লড়াই শেষ পর্যন্ত রক্ত-মাংসের মানুষের ওপর দিয়েই বয়ে যায়। গ্যালের প্রধান ম্যাজিস্ট্রেটের নির্দেশ আর প্রতিরক্ষা সচিবের তৎপরতা হয়তো আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছে, কিন্তু বিয়োগব্যথার যে ক্ষত ইরানি পরিবারগুলোতে তৈরি হলো, তা সহজে শুকোবে না।



