― Advertisement ―

পাসপোর্ট নাগরিকত্বের পরিচয় নয়: ভারতের নতুন প্রশাসনিক জটিলতা

একমাত্র ভারতীয় নাগরিকেরাই পাসপোর্ট পাওয়ার যোগ্য আইনি অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও পাসপোর্ট কোনোভাবেই ভারতীয় নাগরিকত্বের চূড়ান্ত প্রমাণ বা আইডেন্টিটি নথি নয়—কেন্দ্রীয় সরকারের এমন এক সূক্ষ্ম আইনি ব্যাখ্যার জেরে সমগ্র ভারতজুড়ে নাগরিকত্বের পরিচয় নিয়ে নতুন করে তীব্র রাজনৈতিক ও সামাজিক বিতর্ক শুরু হয়েছে। গত বুধবার (২৪ জুন, ২০২৬) ১৪তম ‘পাসপোর্ট সেবা দিবস’ উপলক্ষে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় (MEA) সাফ জানিয়েছে, পাসপোর্ট হলো মূলত একটি আন্তর্জাতিক ‘ট্রাভেল ডকুমেন্ট’ বা বিদেশ ভ্রমণের লাইসেন্স মাত্র, যা নাগরিকত্ব নির্ধারণের কোনো প্রমাণ্য দলিল নয়। চিপনির্ভর নতুন বায়োমেট্রিক পাসপোর্ট সংগ্রহের প্রচারণা চালাতে গিয়ে মন্ত্রণালয়ের দেওয়া এই অনমনীয় বিবৃতিতে সাধারণ মানুষের মনে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন দেখা দিয়েছে—ভোটার কার্ড, আধার, রেশন কার্ড ও পাসপোর্টের মতো সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় নথিও যদি নাগরিকত্বের প্রমাণ না হয়, তবে ভারতে নাগরিকত্বের আসল প্রমাণপত্রটি ঠিক কী?

ভারতের ১৯৬৭ সালের পাসপোর্ট আইন (The Passports Act, 1967) অনুযায়ী, কঠোর পুলিশি তদন্ত ও কঠোর নথিপত্র যাচাইয়ের পর শুধু নিশ্চিত ভারতীয় নাগরিকদেরই পাসপোর্ট ইস্যু করার বিধান রয়েছে। তা সত্ত্বেও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এই সাম্প্রতিক অবস্থান আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ভারতীয় পাসপোর্টের মর্যাদা ও নাগরিকদের জাতিগত অবস্থানকে চরম বিভ্রান্তির মুখে ঠেলে দিয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। ভারতের বিশিষ্ট চিত্রনাট্যকার ও গীতিকার জাভেদ আখতার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘এক্স’ (X)-এ তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে সরকারের এই ব্যাখ্যাকে ‘অযৌক্তিক’ বলে অভিহিত করেছেন। তিনি প্রশ্ন তোলেন, তবে কি ধরে নিতে হবে যে সরকার এমন বিপুলসংখ্যক মানুষকেও পাসপোর্ট বিতরণ করেছে বা করছে, যারা আদৌ এ দেশের নাগরিক নন অথবা যাদের নাগরিকত্ব নিয়ে খোদ সরকার নিজেই সন্দিহান? একইভাবে শিবসেনা নেতা আদিত্য ঠাকরেও কঠোর নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক যাচাইয়ের পর দেওয়া এই নথির আইনি বৈধতা অস্বীকারের সরকারি প্রবণতাকে আন্তর্জাতিক মহলে ভারতীয় মর্যাদার জন্য ক্ষতিকর বলে মন্তব্য করেছেন।

আইনি দিক থেকে কেন্দ্রীয় সরকার এই বিষয়ের ব্যাখ্যা দিয়ে বলছে, কোনো ব্যক্তি যদি ভুয়া বা জাল তথ্য দাখিল করে প্রতারণামূলক উপায়ে পাসপোর্ট সংগ্রহ করে থাকেন, তবে তা যেকোনো মুহূর্তে সম্পূর্ণ বাতিল করার সার্বভৌম অধিকার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের রয়েছে। এই কারণেই প্রতিটি ভারতীয় পাসপোর্টে স্পষ্টভাবে লেখা থাকে—‘এটি ভারত সরকারের সম্পত্তি’। মূলত এই আইনি ফাঁকফোকরের কারণেই একে নাগরিকত্বের অবিসংবাদিত প্রমাণ হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে না। বিষয়টি নিয়ে ভারতের সুপ্রিম কোর্টে বিভিন্ন রাজ্যের ভোটার তালিকার নিবিড় সংশোধনের (SIR) মামলার শুনানির সময় নির্বাচন কমিশনও স্বীকার করেছিল যে আধার, রেশন ও ভোটার কার্ডের মতো নথি এ দেশে প্রতিনিয়ত জাল হচ্ছে। যদিও সর্বোচ্চ আদালত তখন ভোটার তালিকার জন্য আধার কার্ডের বৈধতাকে মান্যতা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন।

সংসদের রেকর্ড অনুযায়ী, ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় (MHA) স্পষ্ট জানিয়েছে যে এ দেশে কোনো নির্দিষ্ট ‘নাগরিকত্ব কার্ড’ বা সিটিজেনশিপ আইডি দেওয়া হয় না এবং নাগরিকত্ব সম্পূর্ণভাবে ১৯৫৫ সালের নাগরিকত্ব আইন (Citizenship Act, 1955) দ্বারা পরিচালিত হয়। এই আইনানুযায়ী জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব প্রমাণের ক্ষেত্রে রয়েছে চরম জটিল সমীকরণ; যেমন ১৯৮৭ সালের আগে জন্মালে শুধু নিজস্ব জন্মসনদ এবং ২০০৪ সালের পরে জন্মালে বাবা-মা দুজনেরই ভারতীয় জন্মসনদ থাকা বাধ্যতামূলক। এদিকে আসামের এনআরসি (NRC) এবং ভারতের নির্বাচন কমিশনের এসআইআর (SIR) উদ্যোগের পর থেকে কোটি কোটি সাধারণ মানুষ বৈধ জমি-বাড়ির দলিল বা স্কুল সার্টিফিকেট থাকা সত্ত্বেও নাগরিকত্ব প্রমাণের লড়াইয়ে হিমশিম খাচ্ছেন। বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গে এসআইআর প্রক্রিয়ার পর প্রায় ২৭ লাখ মানুষের ভোটাধিকার এখনো ফিরিয়ে না দেওয়া এবং তাদের কেন্দ্রীয় রেশন সুবিধা থেকে বঞ্চিত করার বিজেপির সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত ভারতের সামাজিক ও ফেডারেল কাঠামোকে এক অভূতপূর্ব অস্থিরতার দিকে ঠেলে দিয়েছে।