― Advertisement ―

পারভীন হত্যা: খুনি রসু খাঁর মৃত্যুদণ্ড বহাল হাই কোর্টে

চাঁদপুরের পারভীন হত্যা মামলায় আলোচিত খুনি রসু খাঁর মৃতুদণ্ড বহাল রেখেছে হাই কোর্ট।মঙ্গলবার বিচারপতি সৈয়দ মো. জিয়াউল করিম ও বিচারপতি কে এম ইমরুল কায়েশের...

নিয়ন্ত্রণহীন দক্ষিণাঞ্চলের ডেঙ্গু পরিস্থিতি

জহির রায়হান

কোনভাবেই নিয়ন্ত্রণে আসছে না বরিশাল তথা গোটা দক্ষিণাঞ্চলের ডেঙ্গু পরিস্থিতি। এই বিভাগের ৬ জেলার মধ্যে আক্রান্ত ও মৃত্যুর হার সবচেয়ে বেশি বরগুনা জেলায়। শুধু বরিশাল বিভাগ নয়, সারা বাংলাদেশের মধ্যে বরগুনা জেলায় ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত রোগীর হার বেশি।

এনিয়ে উদ্বিগ্ন সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর)। কি কারণে এমন ভয়াবহ পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে তা গবেষণা করতে আইইডিসিআর একটি প্রতিনিধি দল বরগুনায় ছুটে আসে।

আইইডিসিআরের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. রত্মা দাসের নেতৃত্বে ৭ জনের একটি দলটি চলতি মাসের ১৬ থেকে ২২ জুন পর্যন্ত বরগুনায় এসে গবেষণা ও জরিপ চালান। জরিপে উঠে আসে বরগুনার ডেঙ্গু পরিস্থিতির ভয়াবহ চিত্র।

ডেঙ্গু প্রজননক্ষেত্র:
জলাবদ্ধতা, উন্মুক্ত ড্রেন, ব্যবহৃত পানির পাত্র, ফুলদানি, নির্মাণাধীন ভবনে জমে থাকা পানিই মশার জন্য প্রজননক্ষেত্র। এছাড়াও উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষ লবণাক্ততার কারণে বৃষ্টির পানি জমিয়ে রাখে, ফলে সেখানে নিয়মিত এডিস মশার লার্ভা জন্ম নিচ্ছে।

ডেঙ্গুর ধরন:
ডেঙ্গু সাধারণত ডেন ১, ২, ৩ এবং ৪ টি ধরন দিয়ে আক্রান্ত হয়। এই চার ধরনের যে একটি দিয়ে রোগী সংক্রমিত হতে পারেন। তবে কেউ যদি একাধিকবার একাধিক সেরোটাইপ দিয়ে আক্রান্ত হয়, তখন তার অবস্থা মারাত্মক ঝুঁকিতে থাকে।

‘ব্রুটো ইনডেক্স’ কি?
এইডিস মশার লার্ভার ঘনত্ব পরিমাপের সূচককে বলা হয় ‘ব্রুটো ইনডেক্স’। যদি কোনও স্থানে এই ব্রুটো ইনডেক্স ২০ শতাংশের বেশি হলে সেখানকার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় বলে মনে করা হয়।

ডেঙ্গু প্রতিরোধ:
ডেঙ্গু একটি প্রতিরোধযোগ্য রোগ। আক্রান্ত বাড়ির ২০০ মিটারের মধ্যে প্রতিদিন ফগিং ও লার্ভিসাইডিং করা। পাশাপাশি নতুন আক্রান্ত এলাকা চিহ্নিত করে সেখানে পূর্বপ্রস্তুতি নেওয়া প্রয়োজন। পাশাপাশি মশার উৎসস্থল ধ্বংস করা এবং ডেঙ্গু প্রতিরোধে সচেতনতা বাড়ানো।

রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) বরগুনা পৌরসভা এলাকার ১৩৮টি এবং সদর উপজেলার ৪৬টি বাড়ি পরিদর্শন করেছে জরিপকারীরা।

তারা দেখেছেন, সবচেয়ে বেশি লার্ভা পাওয়া গেছে একক আলাদা বাড়িতে; ৫৬ শতাংশ। এরপর সেমি পাকা বাড়িতে ৩৩ শতাংশ, নির্মাণাধীন বাড়িতে ২ শতাংশ আর মাল্টিস্টোরেড ভবনে ৯ শতাংশ। এছাড়াও বরগুনা সদর উপজেলায় ব্রুটো ইনডেক্স পাওয়া গেছে ১৬৩ দশমিক ৪ শতাংশ। যা স্বাভাবিকের থেকে ৮গুণ বেশি। আর পৌরসভার ৯ ওয়ার্ডের এলাকাগুলোতে ৪৭ দশমিক ১০ শতাংশ। এই হার এইডিস মশার উপস্থিতির ঝুঁকিপূর্ণ মাত্রার চেয়ে দ্বিগুণের বেশি।

৯টি ওয়ার্ডের মধ্যে একটি ওয়ার্ডে ব্রুটো ইনডেক্স রয়েছে ১৫৩ দশমিক ৩৩, একটিতে ১৩৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ। মাত্র ৪টিতে ব্রুটো ইনডেক্স ২০ এর নিচে পাওয়া গেছে।

সব মিলিয়ে বরগুনা সদর এলাকা, পাথরঘাটা এবং বামনা এলাকায় ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখা সবচেয়ে বেশি। এরচেয়ে তুলনামূলক কম রোগী বেতাগি এবং আমতলী এলাকায়।

বরিশাল স্বাস্থ্য বিভাগের দৈনিক প্রতিবেদনে থেকে জানা গেছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত বরগুনা জেলায় ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়েছেন ২ হাজার ৮৫৩ জন।

এসময়ে মোট মৃত্যু হয়েছে ৬ জনের। আর সুস্থ হয়ে ছাড়পত্র গ্রহণ করে হাসপাতাল ছেড়েছেন ২ হাজার ৬২৫ জন। বর্তমানে চিকিৎসাধীন রয়েছেন ২২২ জন রোগী।

আরও জানা গেছে, জানুয়ারীতে রোগী ছিল ৩৮ জন, ফেব্রুয়ারিতে ১৪, মার্চে ১২ আর এপ্রিলে ১৬৫ জন। এরপর মে ও জুন মাসে মোট আক্রান্ত হয়েছেন ২ হাজার ৬২৪ জন।

বরিশাল বিভাগের ৬ জেলায় গত ২৪ ঘন্টায় ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়েছেন ১৪৯ জন। এর মধ্যে শুধু বরগুনা জেলাতেই ৭৭ জন। যা অর্ধেকের বেশি।

বিভাগে গত ৬ মাসে (১ জানুয়ারি -৩০ জুন পর্যন্ত) মোট আক্রান্ত হয়েছেন ৪ হাজার ৭৩১ জন, মৃত্যু হয়েছে ১২ জনের। ডেঙ্গু জ্বর থেকে সুস্থ হয়েছেন ৪ হাজার ২৮৭ জন আর বর্তমানে বিভাগের সরকারি হাসপাতালগুলোতে ভর্তি রয়েছেন ৪৩২ জন।

আইইডিসিআর প্রতিষ্ঠানের পরিচালক অধ্যাপক ডা. তাহমিনা শিরীন জরিপ শেষে সাংবাদিকদের জানান, বরগুনা জেলা উপকুলীয় এলাকা। এখানকার পানি লবণাক্ত। ফলে খাওয়ার পানির সঙ্কট রয়েছে দীর্ঘদিনের। তাই বিভিন্ন বাড়িতে বৃষ্টির পানি ড্রামসহ নানা পাত্রে ধরে রাখা হয়। পাত্রগুলো ঠিকমতো পরিষ্কার না করা, দীর্ঘদিন পানি জমিয়ে রাখায় সেখানে মশার লার্ভা জন্মাচ্ছে। এমনকি বাসার ভেতরেও মশার লার্ভা বেশি পাওয়া যাচ্ছে। তাই পানি জমতে দেওয়া যাবে না। জমিয়ে রাখা পানির ড্রামের মুখটা বন্ধ করে রাখলে মশার উপদ্রব থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে বলে পরমর্শ দেন এই পরিচালক।

বরিশাল বিভাগীয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক ডা. শ্যামল কৃষ্ণ মণ্ডল জানান, বরিশালের সরকারি হাসপাতালে যত ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছে তার চেয়েও প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি ।

কারণ হিসেবে তিনি জানান, সরকারী হাসপাতালে পাশাপাশি বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিকে ভর্তি হওয়াসহ অনেক রোগী বাসা বাড়িতেও চিকিৎসা নিয়ে থাকেন। সেই সংখ্যা স্বাস্থ্য বিভাগের কাছে নেই। সেই সংখ্যা থাকলে বরিশালের সবাই বুঝতো ডেঙ্গু কত ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে।

টিবিএম/জ/রা