― Advertisement ―

পারভীন হত্যা: খুনি রসু খাঁর মৃত্যুদণ্ড বহাল হাই কোর্টে

চাঁদপুরের পারভীন হত্যা মামলায় আলোচিত খুনি রসু খাঁর মৃতুদণ্ড বহাল রেখেছে হাই কোর্ট।মঙ্গলবার বিচারপতি সৈয়দ মো. জিয়াউল করিম ও বিচারপতি কে এম ইমরুল কায়েশের...

এক মাসে নাফ নদী থেকে শতাধিক জেলে নিখোঁজ

নিজস্ব প্রতিবেদক
বাংলাদেশ ও মিয়ানমার এই দুই দেশকে ভাগ করেছে কক্সবাজার জেলার টেকনাফ উপজেলায় অবস্থিত নাফ নদী। এই নদী থেকে গত এক মাসে শতাধিক বাংলাদেশী জেলে নিখোঁজ হয়েছেন বলে অভিযোগ করছেন স্থানীয় বোট মালিক ও মাছ ব্যবসায়ীরা।

নদী থেকে একের পর এক বাংলাদেশি জেলে নিখোঁজ কিংবা অপহরণের ঘটনায় উদ্বেগ তৈরি হয়েছে জেলেদের মধ্যে।

নিখোঁজদের স্বজনেরা বলছেন, মিয়ানমারের সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরাকান আর্মি নাফ নদী থেকে বাংলাদেশি জেলেদের ধরে নিয়ে যাচ্ছে। যদিও বাংলাদেশের কোস্টগার্ড বলছে, বাংলাদেশের জলসীমা থেকে কোনো আটক বা অপহরণের ঘটনা ঘটছে না।

কেন আরাকান আর্মি জেলেদের ধরে নিয়ে যাচ্ছে?
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে আরাকন আর্মির হাতে আটক হয়েছিলেন শাহপরী দ্বীপের জেলে আব্দুর রহমান। আটকের আট দিন পর আরাকান আর্মি তাকে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) কাছে ফেরত দেয়।

এ বিষয়ে আব্দুর রহমান গণমাধ্যমে জানিয়েছেন, তাকেসহ যেসব জেলেকে তখন ধরে নিয়ে যাওয়া হয়েছিলো, তাদের বিরুদ্ধে মিয়ানমারের জলসীমায় ঢুকে পড়ার অভিযোগ আনে আরাকান আর্মি।

তিনি বলেন, “ওরা বলতেছিলো, তোমরা মিয়ানমার সীমানায় কেন মাছ ধরতে আসছো? আমার তো মনে করছি এটা বাংলাদেশের সীমানা। কিন্তু ওরা বলতেছিলো আমরা ওদের এলাকায় ঢুকে গেছি।”

পরে আব্দুর রহমানসহ নৌকায় থাকা জেলেদের হাত-পা বেঁধে নিয়ে যাওয়া হয় মিয়ানমারে আরাকান আর্মির ডেরায়। সেখানে একটি ঘরে তালাবদ্ধ করে রাখা হয় এক সপ্তাহ। অষ্টম দিনে তারা মুক্তি পায় এবং বিজিবির মাধ্যমে বাংলাদেশে ফেরত আসে।

স্থানীয়রা বলছেন, ফেব্রুয়ারি থেকেই নাফ নদীর মোহনাসহ বিভিন্ন স্থানে মিয়ানমারের বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরাকান আর্মির তৎপরতা বৃদ্ধি পেয়েছে।

কেন মিয়ানমারের জলসীমায় ঢুকছেন জেলেরা?

বাংলাদেশের জলসীমা অতিক্রম করে মিয়ানমারের জলসীমায় ঢুকে পড়ার নানা কারণ রয়েছে। অসাবধানতা এবং বেশি মাছ পাওয়ার আশায় এমটা ঘটছে বলে মনে করে কোস্টগার্ড।

তবে এর বাইরে আরও দুটি কারণের কথা বলছেন জেলেরা। প্রথমত হচ্ছে, নাফ নদীর মোহনায় নাইক্ষংদিয়া এলাকায় ডুবোচরের কারণে বাংলাদেশ অংশে পানির গভীরতা কমে গেছে।

কিন্তু মিয়ানমারের জলসীমা ঘেঁষে পানির গভীরতা বেশি থাকায় অনেকে সেই পথ দিয়ে যাতায়াত করেন। আর দ্বিতীয় কারণ হচ্ছে, মাছ ধরার সময় তীব্র স্রোতের টানে কখনও কখনও নৌকা ভেসে মিয়ানমারের অংশে চলে যায়।

টেকনাফ পৌর বোট মালিক সমিতির সভাপতি সাজেদ আহমেদ বলেন, “আগেও বিভিন্ন সময় বাস্তবতার কারণে এমনটা হয়েছে। কিন্তু তখন মিয়ানমার আর্মি আটকায় নাই। এখন আরাকান আর্মি আসার পরে কড়াকড়ি শুরু করেছে।”

কেন আরাকান আর্মির এই বাড়তি তৎপরতা?
আরাকান আর্মি যে সীমান্তে তৎপরতা বাড়িয়েছে সেটা স্পষ্ট। যেটাকে জেলেরা দেখছেন, অনেকটা ‘আক্রমণাত্মক’ অবস্থান হিসেবে। মিয়ানমার জান্তা সরকারের কাছ থেকে সীমান্তের দখল নেওয়ার পর পরিস্থিতি পাল্টে গেছে।

তবে আরাকান আর্মি যে শুধু মিয়ানমারের জলসীমায় ঢুকলে বাধা দিচ্ছে কিংবা আটক করছে তেমনটা নয়। বাংলাদেশি জেলেদের কেউ কেউ দাবি করছেন, আরাকান আর্মির সদস্যরা অতীতে বাংলাদেশের জলসীমায় ঢুকেও জেলেদের ধরে নিয়ে গেছেন।

আরাকান আর্মির নিজস্ব কিছু ওয়েবসাইট ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করেন। যেগুলো জান্তা সরকারকে জানান দেওয়া এবং নিজেদের তৎপরতা দেখানোর উদ্দেশ্যে করা হয় বলে মনে করেন সামরিক বিশ্লেষকেরা।

আরাকান আর্মির সাম্প্রতিক তৎপরতা:
আরাকানের বিভিন্ন ওয়েবসাইট এবং সামাজিক মাধ্যমগুলোতে নাফ নদী কিংবা সাগরে আরাকান আর্মির বিভিন্ন অভিযানের খবর, ছবি ও ভিডিও প্রকাশ করা হয়েছে। এরকম কিছু ভিডিও এবং ছবি ঘেঁটে দেখা যায়, আরাকান আর্মির সদস্যরা স্পিড বোটে করে জেলেদের নৌকাকে ধাওয়া করছেন।

পরে মিয়ানমারের জলসীমায় অনুপ্রবেশের দায়ে নৌকা এবং জেলেদের আটকের ছবি এবং ভিডিও আরাকান আর্মির নিজস্ব ওয়েবসাইট ও স্থানীয় সংবাদমাধ্যমগুলোতে প্রকাশ করা হয়।

এরকম কয়েকটি ছবি ও ভিডিওতে যেসব জেলেকে দেখা গেছে, তাদের অনেককে বাংলাদেশের জেলে বলে শনাক্ত করেছেন তাদের স্বজনেরা। যদিও এসব জেলে নৌকা মিয়ানমার নাকি বাংলাদেশের জলসীমা থেকে আটক হয়েছে, সেটা স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি।

বাংলাদেশের নিরাপত্তা বাহিনী ও স্থানীয়রা কিছু কারণ উল্লেখ করছেন:
প্রথমত, মিয়ানমারের জান্তা সরকার বিদ্রোহী আরাকান আর্মির কাছ থেকে আরাকান রাজ্যের পুনরায় দখল নিতে চাইছে। এর অংশ হিসেবে সাম্প্রতিক সময়ে সীমান্ত এলাকায় মিয়ানমারের জঙ্গি বিমান উড়তে দেখেছেন বাংলাদেশি জেলেরা। সবমিলিয়ে নৌপথে সরকারি বাহিনীর হামলার আশঙ্কায় নদী ও সাগরে কড়া নজরদারি করছে বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরাকান আর্মি।

দ্বিতীয়ত, জেলেদের নৌকা আটকের পর লাখ লাখ টাকার মাছ, জাল, খাবার ও অন্যান্য সরঞ্জাম দখল করে নিজেরা তা বিক্রি করে টাকা রোজগার করছেন।

আর তৃতীয়ত, জেলেদের আটকের মাধ্যমে বাংলাদেশ সরকারের সাথে আনুষ্ঠানিক যোগাযোগ স্থাপন, ব্যবসা পরিচালনা এবং এর মাধ্যমে একধরণের বৈধ কর্তৃপক্ষ হিসেবে স্বীকৃতি আদায়ের চেষ্টা করছে আরাকান আর্মি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে কোস্টগার্ডের টেকনাফ স্টেশন কমান্ডার লেফটেন্যান্ট কমান্ডার মাহমুদুল হাসান বলেন, “আমরা তো আমাদের জলসীমায় কার্যক্রম পরিচালনা করি। আমরা বেশিরভাগ সময় দেখেছি, জেলেরা বাংলাদেশ-মিয়ানমার যে সীমারেখা আছে, সেই সীমারেখা অতিক্রম করার কারণে তাদেরকে ধরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। বিশেষ করে বেশি মাছ ধরার আশায় অথবা অসাবধানতাবশত: তারা বাংলাদেশের সীমারেখা অতিক্রম করছেন।”

তবে বাস্তবতা হচ্ছে বাংলাদেশি জেলেরা একের পর এক আটক হচ্ছেন এবং শতাধিক জেলে আটক হওয়ার পর তাদের খোঁজ কিংবা ফেরত আনাও যাচ্ছে না। তবে এটা বোঝা যাচ্ছে যে, রাখাইনে নির্দিষ্ট বৈধ কোন সরকারের অস্তিত্ব না থাকায় জেলেদের ফিরিয়ে আনা সময়সাপেক্ষ হতে পারে।

এ বিষয়ে সরকারের পদক্ষেপ জানতে পররাষ্ট্র উপদেষ্টার বক্তব্য চাওয়া হলেও সরকারের পক্ষ থেকে কোনও সাড়া পাওয়া যায়নি।