চলমান প্রাকৃতিক দুর্যোগ, প্লাবন ও ব্যাপক জলাবদ্ধতার প্রতিকূল পরিস্থিতি উপেক্ষা করে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত এবং পরীক্ষার্থীদের উদ্দেশ্য করে শিক্ষামন্ত্রীর করা একটি চরম অবমাননাকর মন্তব্য দেশজুড়ে তীব্র গণক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলনের তাৎক্ষণিক পদত্যাগের এক দফা দাবিতে বিক্ষোভে ফেটে পড়েছেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা। মঙ্গলবার দুপুরের পর থেকে ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহীসহ দেশের অন্তত ১৪টি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক জেলায় এইচএসসি পরীক্ষার্থীরা একযোগে সড়ক অবরোধ ও শিক্ষা বোর্ড ঘেরাও কর্মসূচি পালন করেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি বিতর্কিত অডিওকে কেন্দ্র করে এই ক্ষোভ নতুন মাত্রা লাভ করেছে, যেখানে শিক্ষার্থীদের ‘ফার্মের মুরগি’ বা ‘ব্রয়লার চিকেন’ হিসেবে সম্বোধন করার অভিযোগ উঠেছে মন্ত্রীর বিরুদ্ধে। এই অপমানজনক মন্তব্যের জেরে দেশের ‘জেন-জি’ তথা তরুণ প্রজন্ম সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র প্রতিবাদ গড়ে তুলেছে। এরই ধারাবাহিকতায় ফেসবুকে ‘ব্রয়লার চিকেন পার্টি’ (Broiler Chicken Party) নামে একটি নতুন পেজ ও ভার্চুয়াল প্ল্যাটফর্ম চালু করা হয়েছে, যা ক্ষণিকের মধ্যেই হাজার হাজার ফলোয়ার আকৃষ্ট করে আন্দোলনের প্রধান ডিজিটাল কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।
মাঠপর্যায়ের বিক্ষোভে অংশ নেওয়া পরীক্ষার্থীদের প্রধান অভিযোগ হলো, দেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে চলমান বন্যা ও অতিবৃষ্টির কারণে গত সোমবারের পদার্থবিজ্ঞান পরীক্ষায় বহু শিক্ষার্থী কেন্দ্রে পৌঁছাতে পারেননি। তদুপরি, দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার মাঝে সরবরাহ করা প্রশ্নপত্রটি সম্পূর্ণ সংক্ষিপ্ত সিলেবাসের বাইরে থেকে অত্যন্ত কঠিন ও ত্রুটিপূর্ণভাবে প্রণয়ন করা হয়েছিল। আন্দোলনকারীরা স্পষ্ট জানিয়েছেন, দুর্যোগ স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত পরীক্ষা স্থগিত রাখা, ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্মূল্যায়ন পরীক্ষা নেওয়া এবং মন্ত্রীর প্রকাশ্যে ক্ষমা চাওয়ার দাবি আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে পূরণ না হলে তীব্র আন্দোলন অব্যাহত থাকবে।
ঢাকার উপকণ্ঠ সাভারে শিক্ষা ব্যবস্থা সংস্কারের দাবিতে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার্থীরা ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ করে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন। সাভারের পাকিজা এলাকার শহীদ ইয়ামিন চত্বরে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শত শত শিক্ষার্থী অবস্থান নিলে এই গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক মহাসড়কে প্রায় এক ঘণ্টা সব ধরনের যান চলাচল বন্ধ থাকে। মহাসড়কের উভয় পাশে মালবাহী ও যাত্রীবাহী যানবাহনের মাইলের পর মাইল দীর্ঘ যানজট তৈরি হওয়ায় সাধারণ যাত্রী, চাকুরিজীবী এবং চালকদের সীমাহীন দুর্ভোগ পোহাতে হয়।
দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম মহানগরী চট্টগ্রামেও ক্ষোভের আগুন ছড়িয়ে পড়ে। নগরীর ব্যস্ততম ষোলশহর ও ২ নম্বর গেট এলাকায় বিভিন্ন কলেজের পরীক্ষার্থীরা অবস্থান নিয়ে প্রধান সড়ক অবরুদ্ধ করে রাখেন। পাঁচলাইশ থানা পুলিশের ব্যাপক উপস্থিতির মাঝে শিক্ষার্থীরা শান্তিপূর্ণভাবে তাঁদের ৩ দফা দাবিতে স্লোগান দেন। পরবর্তীতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের একটি প্রতিনিধি দল চট্টগ্রাম মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের প্রশাসনের কাছে গিয়ে তাদের সুনির্দিষ্ট দাবি সম্বলিত একটি স্মারকলিপি আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করে।
দক্ষিণাঞ্চলের প্রধান যোগাযোগ অক্ষ ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কে পরীক্ষার্থীদের অবরোধের কারণে নথুল্লাবাদ কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল থেকে দূরপাল্লার এবং অভ্যন্তরীণ ১৪টি রুটের সমস্ত বাস চলাচল সম্পূর্ণ অচল হয়ে পড়ে। বরিশাল শিক্ষা বোর্ডের সামনে অবস্থান নেওয়া শিক্ষার্থীদের বুঝাতে ব্যর্থ হয় স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন। এই দীর্ঘ অবরোধের ফলে অ্যাম্বুলেন্সে থাকা জরুরি ও সংকটাপন্ন রোগীরা তীব্র ভ্যাপসা গরমে আটকা পড়ে চরম স্বাস্থ্যঝুঁকির সম্মুখীন হন, যা সাধারণ মানুষের দুর্ভোগকে চরমে নিয়ে যায়।
শিল্পনগরী খুলনার ব্যস্ততম শিববাড়ী মোড়ে দুপুর থেকে কয়েক শ শিক্ষার্থী অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন। তারা গত সোমবারের পদার্থবিজ্ঞান প্রথম পত্রের প্রশ্নপত্রের ৬ ও ৭ নম্বর প্রশ্নে মারাত্মক ভুল থাকার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ তুলে শিক্ষামন্ত্রীর বিরুদ্ধে ভুয়া-ভুয়া স্লোগান দেন। একই চিত্র দেখা গেছে ময়মনসিংহের টাউন হল মোড়ে, যেখানে শিক্ষার্থীরা সড়ক ছেড়ে পরবর্তীতে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে গিয়ে অবস্থান নেন। অন্যদিকে, কুমিল্লার কান্দিরপাড় পূবালী চত্বরে ‘সচেতন শিক্ষার্থী সমাজ’ এর ব্যানারে মিছিল নিয়ে কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ড প্রাঙ্গণ ঘেরাও করা হয়।
উত্তরবঙ্গের প্রবেশদ্বার বগুড়ার ঐতিহাসিক সাতমাথা এলাকা ‘ব্লকেড’ বা সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ করে রাজপথে বসে পড়েন বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা। এর আগে জেলা প্রশাসক সুনির্দিষ্ট কোনো আশ্বাস না দেওয়ায় শিক্ষার্থীরা সাতমাথায় এই কঠোর অবস্থান নেন, যেখানে পরবর্তীতে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ এসে শিক্ষার্থীদের শান্ত করার চেষ্টা করেন। অন্যদিকে, টাঙ্গাইলের বঙ্গবন্ধু সেতু বাইপাসের জলপাই এলাকায় মহাসড়ক অবরোধের ফলে যমুনা সেতুগামী লেনে সোয়া এক ঘণ্টা যান চলাচল পুরোপুরি স্তব্ধ হয়ে যায়।
একই দাবিতে রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডের অভ্যন্তরে ঢুকে ঘেরাও কর্মসূচি পালন করেন বিভিন্ন কলেজের শত শত পরীক্ষার্থী। এছাড়া সিলেট কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের সামনে প্রখর রোদে অবস্থান কর্মসূচি পালন করায় চৌহাট্টা-জিন্দাবাজার সড়কে তীব্র যানজট তৈরি হয়। দেশের দূরবর্তী প্রান্তিক জেলা কুড়িগ্রামের প্রেসক্লাবের সামনে মানববন্ধন, সুনামগঞ্জের আলফাত স্কয়ারে বিক্ষোভ এবং নওগাঁর জেলা শিক্ষা অফিসের সামনে মুক্তির মোড়ে শত শত শিক্ষার্থীর সমাবেশ থেকে পরীক্ষা ব্যবস্থাপনায় চরম ব্যর্থতার দায়ে শিক্ষাসচিবের অপসারণও দাবি করা হয়।



